
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত বন্ধ, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন দুই দেশের কর্মকর্তারা। এই ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি; বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী আলোচনা অব্যাহত থাকবে বলে জানা গেছে।
সোমবার (১৫ জুন) ভোরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। এর কিছুক্ষণ আগেই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ উভয় পক্ষের সমঝোতায় পৌঁছানোর ঘোষণা দেন।
জানা গেছে, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে চুক্তির স্মারক আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। যদিও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
শেহবাজ শরিফ জানান, সমঝোতার আওতায় লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিবালয়ও জানিয়েছে, সোমবার রাত থেকেই সব ধরনের সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে।
ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ পোস্টে বলেন, আগামী শুক্রবার থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হবে। একই সঙ্গে তিনি ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন।
এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা যায়। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৪ শতাংশ এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ৪ দশমিক ৬ শতাংশের বেশি কমেছে। পাশাপাশি এশিয়ার শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদী বলেন, ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময় আরও বিস্তৃত একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা হবে। সেখানে নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎও আলোচনার অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এর আগে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছিল, ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এবং পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎই হবে আলোচনার সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলোর একটি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাতে ইরান ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। সংঘাত চলাকালে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ সৃষ্টি করে, যার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো অবরুদ্ধ করে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির উচ্চমূল্য ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। একই সময়ে রিপাবলিকান পার্টির একটি অংশ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করার দাবি জানিয়ে আসছে।
রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম চুক্তিকে স্বাগত জানালেও পারমাণবিক ইস্যুতে ভবিষ্যৎ আলোচনার দিকে নজর রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, ইরানের সঙ্গে যেকোনো পারমাণবিক চুক্তি কংগ্রেসে পর্যালোচনা ও ভোটের জন্য পাঠানো উচিত।
অন্যদিকে, চুক্তি ঘোষণার আগে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু লেবাননে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিলেও, ইরান সেখানে পূর্ণ যুদ্ধবিরতিকেই অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে তুলে ধরে।
এর আগে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ‘খুবই কঠিন মানুষ’ বলে মন্তব্য করেন এবং দাবি করেন, ইসরায়েলকে পারমাণবিক অস্ত্রধারী ইরানের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করায় তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
তবে চুক্তির বিস্তারিত শর্ত, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়গুলো আগামী কয়েক সপ্তাহের আলোচনার অগ্রগতির ওপরই নির্ভর করবে।
প্রতিবেদকের নাম 

























