একসময় গ্রামবাংলার সমৃদ্ধির প্রতীক ছিল ‘গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ’। কৃষকের ঘরে বাঁশের তৈরি ধানের গোলা থাকাই ছিল স্বচ্ছলতা, নিরাপত্তা ও সুখ-সমৃদ্ধির অন্যতম পরিচয়। কিন্তু আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার বিস্তারে শতবর্ষের সেই ঐতিহ্যবাহী ধানের গোলা এখন বিলুপ্তির পথে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই বাঁশের তৈরি গোলা শুধু বইয়ের পাতায় কিংবা প্রবীণদের স্মৃতিচারণেই চিনে।
ইতিহাসবিদদের মতে, বাংলার কৃষিভিত্তিক সমাজে শত শত বছর ধরে বাঁশ, বেত ও কাঠ দিয়ে তৈরি গোলায় ধান সংরক্ষণের প্রচলন ছিল। মৌসুম শেষে কৃষকরা ধান ভালোভাবে শুকিয়ে গোলায় মজুত রাখতেন, যাতে সারা বছরের খাদ্য সংরক্ষণ করা যায় এবং আর্দ্রতা, ইঁদুর ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে শস্য রক্ষা পায়। অধিকাংশ গোলা মাটির ওপরে উঁচু খুঁটির ওপর নির্মাণ করা হতো, যাতে বন্যার পানি বা স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশের প্রভাব না পড়ে।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে এখনও দু-একটি পুরোনো বাঁশের গোলার দেখা মিললেও সেগুলোর বেশিরভাগই সময়ের ভারে জীর্ণ। কোথাও বাঁশ পচে গেছে, কোথাও কাঠামো ভেঙে পড়েছে। অযত্ন-অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার কৃষি সংস্কৃতির এই অনন্য ঐতিহ্য।
কৃষি গবেষকদের মতে, আধুনিক চালকল, গুদাম, প্লাস্টিক ও টিনের সংরক্ষণ ব্যবস্থা, কম্বাইন হারভেস্টারের ব্যবহার এবং বাজারভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থার প্রসারের ফলে ধানের গোলার ব্যবহার দ্রুত কমে গেছে। বর্তমানে অধিকাংশ কৃষক ফসল ঘরে তোলার পরই তা বিক্রি করে দেন। ফলে দীর্ঘদিন ধান সংরক্ষণের প্রয়োজন আগের তুলনায় অনেক কমে এসেছে।
প্রবীণ কৃষকদের ভাষ্য, একসময় গোলা ভরা ধান দেখেই একটি পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ও সমৃদ্ধি বোঝা যেত। এখন সেই দৃশ্য প্রায় বিলুপ্ত। তাদের মতে, ধানের গোলার সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ জীবনের আবেগ, ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সংস্কৃতিবিদদের মতে, বাঁশের তৈরি ধানের গোলা শুধু শস্য সংরক্ষণের একটি পদ্ধতি নয়; এটি বাংলার কৃষিনির্ভর সভ্যতা, লোকজ স্থাপত্য ও গ্রামীণ জীবনধারার এক মূল্যবান ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে স্থানীয় প্রশাসন, সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান এবং জাদুঘরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
পলাশবাড়ী (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি 




















