
চেক ডিজঅনার (এনআই অ্যাক্ট) সংক্রান্ত মামলার বিচারিক এখতিয়ার পরিবর্তনের কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা। আদালত স্থানান্তরের কারণে মামলার নম্বর ও শুনানির খবর নিতে আইনজীবীদের ঘুরতে হচ্ছে একাধিক আদালত ও দপ্তরে। এমনকি তথ্য পেতে পেতে পার হয়ে যাচ্ছে শুনানির তারিখও। অনেক ক্ষেত্রে বাদীপক্ষের আইনজীবীরা সময়মতো আদালতে উপস্থিত হতে পারছেন না। আবার কোথাও আসামির বিরুদ্ধে জারি হচ্ছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। এমনকি মামলা তথ্য খুঁজে না পাওয়ায় আইনজীবীর অনুপস্থিতিতে আসামির খালাস পাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
ঢাকার মহানগর দায়রা জজ, জেলা জজ, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের একাধিক আদালত ঘুরে এই তথ্য জানা গেছে। চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত ৫০ হাজারের বেশি মামলা বর্তমানে স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন পুরোনো মামলাগুলোর আইনজীবীরা। ২০০৯ সালে দায়ের হওয়া মামলার পাশাপাশি ২০২৬ সালে দায়ের হওয়া মামলাও স্থানান্তর করা হচ্ছে। এসব মামলার কোনো কোনোটি সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা ও যুক্তিতর্ক শেষ হয়ে রায়ের অপেক্ষায় ছিল। সেসব মামলার নথিও এখন এক আদালত থেকে অন্য আদালতে পাঠানো হচ্ছে।
নথির জটিলতায় বিচার ব্যাহত, এই সুযোগে খালাস আসামি
নথি জটিলতার ভোগান্তির বিষয়ে ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী সানজিতা পারভীন এনটিভি অনলাইনকে জানান, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তার একটি মামলা ঢাকার মহানগর দায়রা জজ কোর্ট থেকে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়। এরপর তিনি ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের রেকর্ড শাখায় মামলাটি খুঁজতে যান। একাধিকবার ওই দপ্তরে গিয়েও মামলার নথি খুঁজে পাননি।
পরে জানতে পারেন, মামলায় দাবিকৃত টাকার পরিমাণ পাঁচ লাখ টাকার কম হওয়ায় সেটি মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্থানান্তর করা হয়েছে। কিন্তু সময়মতো মামলাটি কোন আদালতে পাঠানো হয়েছে, তা জানতে না পারায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারেননি তিনি। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট আদালতে মামলার কার্যক্রম চলতে থাকে এবং তার অনুপস্থিতিতে আসামি খালাস পান।
সানজিদা ঘোষ বলেন, মামলাটি কোথায় স্থানান্তর করা হয়েছে, তা সময়মতো জানতে পারিনি। ফলে আদালতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ হয়নি। আমার অনুপস্থিতিতে আসামি খালাস পেয়েছেন। এতে আমার অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।
তিনি জানান, শুধু তিনি নন, এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন আরও অনেক আইনজীবী। এছাড়া তিনি বলেন, প্রতিদিনের বাড়তি কাজের সঙ্গে এখন এই মামলাগুলো খুঁজে বের করা খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
রায় হওয়ার জন্য নির্ধারিত মামলাও স্থানান্তর
নিম্ন আদালতে বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে বড় অংশ চেক ডিজঅনারের মামলা। এতদিন চেক ডিজঅনারের মামলায় টাকার পরিমাণ যা-ই হোক, সেগুলোর বিচার হতো যুগ্ম দায়রা জজ এবং যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতে।
চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৪১ ধারা সংশোধন করা হয়। সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত চেক ডিজঅনার মামলার বিচার করবেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট। আর পাঁচ লাখ টাকার বেশি অঙ্কের মামলার বিচার করবেন যুগ্ম দায়রা জজ অথবা যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ। বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত ও কার্যকর করাই ছিল এই সংশোধনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
তবে নতুন বিধান বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন আইনজীবীরা। তাদের অভিযোগ, নতুন নিয়ম শুধু নতুন দায়ের হওয়া মামলার ক্ষেত্রে কার্যকর না করে আগে থেকে বিচারাধীন মামলাগুলোও স্থানান্তর করা হচ্ছে।
ফলে কোনো মামলায় দীর্ঘদিন ধরে সাক্ষ্যগ্রহণ চলেছে, কোনো মামলায় আসামির পরীক্ষা শেষ হয়েছে, কোনোটি চূড়ান্ত যুক্তিতর্কের পর্যায়ে পৌঁছেছে, আবার কোনোটি ছিল রায়ের অপেক্ষায়— এমন সব মামলার নথিও এখন নতুন আদালতে স্থানান্তর করা হচ্ছে।
এক মামলা ঘুরছে কয়েক দপ্তরে
ঢাকা মহানগর এলাকায় ৩৬টি থানার বিপরীতে রয়েছে ৩৬টি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। নতুন ব্যবস্থায় পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত চেক ডিজঅনার মামলাগুলো এসব ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্থানান্তর করার কথা।
তবে আগের বিচারিক আদালত থেকে মামলার নথি সরাসরি সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হচ্ছে না। প্রথমে নথি পাঠানো হচ্ছে মহানগর দায়রা জজ আদালতের রেকর্ড শাখায়। সেখান থেকে পাঠানো হচ্ছে মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জেপি শাখায়। এরপর জেপি শাখা থেকে ৩৬টি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নির্দিষ্ট আদালতে পাঠানো হচ্ছে।
প্রতিটি ধাপে নথি গ্রহণ, রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্তি এবং পরবর্তী দপ্তরে পাঠানোর কাজ করতে হচ্ছে।
ফলে আইনজীবীদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—‘মামলাটি এখন কোথায়?’
উত্তর খুঁজতে তাদের যেতে হচ্ছে রেকর্ড শাখা, জেপি শাখা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট আদালতেও।
মামলা ব্যবস্থাপনায় চাপে জেপি শাখা
ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জেপি শাখার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক মামলা স্থানান্তর হওয়ায় তারাও বেশ চাপে রয়েছেন। তিনি বলেন, মামলার নথি গ্রহণ, রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্তি এবং পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠাতে সময় লাগছে। জনবলসংকটও এ সমস্যার অন্যতম কারণ।
আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা যাতে স্থানান্তরিত মামলার অবস্থান জানতে পারেন, সে জন্য স্থানান্তরিত মামলার তথ্যসংবলিত রেজিস্টারের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা। তবে এত বিপুলসংখ্যক মামলার মধ্যে নির্দিষ্ট একটি মামলা খুঁজে বের করা কঠিন বলে স্বীকার করেন তিনি।
একটি নথি স্থানান্তরেও একাধিক ধাপ
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পঞ্চম যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালতের বেঞ্চ সহকারী শাহ আলম গণমাধ্যমকে বলেন, একটি মামলার নথি অন্য আদালতে স্থানান্তরের আগে কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। তিনি বলেন, একটি মামলার নথি স্থানান্তরের আগে বেশ কয়েকটি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। একাধিক রেজিস্টারে এন্ট্রি করতে হয়। জনবলও কম। একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক মামলা স্থানান্তর হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে আমাদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে।
আট আদালতের মামলা স্থানান্তর
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের অধীনে সাতটি যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালত রয়েছে। এ ছাড়া পরিবেশ আদালতেও চেক ডিজঅনার মামলার বিচার হয়। এসব আদালতে বিচারাধীন পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত মামলাগুলোও নতুন বিধান অনুযায়ী স্থানান্তর করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অধীনে রয়েছে ছয়টি যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালত। এসব আদালতে বিচারাধীন পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত চেক ডিজঅনার মামলাও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্থানান্তর করা হচ্ছে।
অর্থাৎ মহানগর পর্যায়ের আটটি এবং জেলা পর্যায়ের ছয়টি আদালত থেকে বিপুলসংখ্যক মামলা একযোগে সরিয়ে নতুন বিচারিক কাঠামোর আওতায় আনা হচ্ছে।
মামলা স্থানান্তর : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ফারাক
নতুন আইন প্রণয়নের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত করা। কিন্তু আইনজীবীদের মতে, বাস্তবায়নের পদ্ধতির কারণে সেই উদ্দেশ্যই এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
একটি মামলার নথি নতুন আদালতে পৌঁছাতে যদি একাধিক দপ্তর ঘুরতে হয় এবং আইনজীবী যদি মামলাটি কোথায় বিচারাধীন, সেটিই জানতে না পারেন, তাহলে কার্যকরভাবে শুনানিতে অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এর ফলে আইনজীবীদের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বাদী ও আসামি উভয় পক্ষের বিচারপ্রার্থীরা।
একদিকে বাদী সময়মতো আদালতে উপস্থিত হয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ হারাতে পারেন। অন্যদিকে, মামলাটি বর্তমানে কোন আদালতে রয়েছে, তা জানতে না পারায় বা আদালতের অবস্থান সম্পর্কে অবগত না থাকায় আসামির বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
মামলা স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি
আইনজীবী সানজিদার মতে, মূল সমস্যা নতুন বিধান নয়, বরং এটি বাস্তবায়নের পদ্ধতি। তিনি বলেন, গেজেট প্রকাশের পর দায়ের হওয়া মামলাগুলোর ক্ষেত্রে নতুন বিধান কার্যকর করা হলে এ পরিস্থিতি এড়ানো যেত। আগে থেকে বিচারাধীন মামলাগুলো সংশ্লিষ্ট আদালতেই নিষ্পত্তির সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল।
বিশেষ করে যেসব মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে এবং চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক কিংবা রায়ের পর্যায়ে রয়েছে, সেগুলো আগের আদালতে রেখে নিষ্পত্তির সুযোগ দিলে বিচারপ্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা বজায় থাকত বলে মনে করেন তিনি।
অনলাইন ব্যবস্থাপনার দাবি
স্থানান্তরিত মামলাগুলোর জন্য অন্তত একটি কেন্দ্রীয় অনলাইন ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
তাদের মতে, প্রতিটি মামলার নম্বর, আগের আদালতের নাম, স্থানান্তরের তারিখ, নতুন আদালতের নাম এবং মামলার নথি বর্তমানে কোথায় রয়েছে—এসব তথ্য অনলাইনে পাওয়া গেলে ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে।
তাহলে শুধু একটি মামলা খুঁজতে আইনজীবীদের রেকর্ড শাখা, জেপি শাখা এবং ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ঘুরতে হবে না।
এ বিষয়ে ঢাকা বারের সহ-সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, বিচারিক এখতিয়ারের পরিবর্তন কার্যকর করার সময় একটি উপযুক্ত অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা বা রূপান্তরকালীন পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন ছিল।
আবুল কালাম আজাদ আরও বলেন, একজন বিচারপ্রার্থীর কাছে আদালতের নাম কিংবা মামলার নথি কোথায় রয়েছে, সেটি মুখ্য বিষয় নয়; বরং তার মামলা যেন কোনো বাধা ছাড়াই এগিয়ে চলে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই আদালত পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু স্থানান্তরিত মামলাগুলোই যদি খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে দ্রুত বিচার নিশ্চিত হওয়ার পরিবর্তে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তির নতুন অধ্যায় তৈরি হতে পারে।
প্রতিবেদকের নাম 




















