প্রতিদিন সকাল ৯টা বাজতেই বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে দেখা যায় এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য। হাতে বাঁশি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন প্রধান শিক্ষক বি আর বিলকিস। তার বাঁশির সুরে সারিবদ্ধ হয়ে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে শিক্ষার্থীরা। এরপর জাতীয় সংগীত, শারীরিক কসরত এবং নিয়মিত পাঠদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনের কার্যক্রম।
এই শৃঙ্খলা ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বি আর বিলকিস। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতা-২০২৬-এ তিনি দেশের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক (মহিলা) নির্বাচিত হয়েছেন।
একাধিকবার উপজেলা, জেলা ও বিভাগসেরা
শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান, বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং দক্ষ প্রশাসনিক নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের চূড়ান্ত মূল্যায়নে তাকে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ নির্বাচিত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে তিনি এই পুরস্কার গ্রহণ করেন।
এর আগে ১২ বার সোনারগাঁ উপজেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক এবং আটবার নারায়ণগঞ্জ জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন বিলকিস। ঢাকা বিভাগেও দুইবার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষকের স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি।
ঝরে পড়া কমানো থেকে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা
ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন বিলকিস। তার নেতৃত্বে বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার হার কমানো, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের ব্যবহার এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ২০ জন এবং শিক্ষক রয়েছেন ১৩ জন। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশ। বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের তিনটি স্তরে—উত্তম, মধ্যম ও পিছিয়ে পড়া—ভাগ করে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়। বিদ্যালয়ের দাবি অনুযায়ী, প্রায় ৯৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়তে ও লিখতে সক্ষম।
স্কুলের পরও শিক্ষার্থীদের খোঁজ
প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ করা হয়। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষকসংখ্যা অনুযায়ী ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে শিক্ষকেরা রাতে শিক্ষার্থীদের বাড়িতে গিয়ে পড়াশোনার খোঁজ নেন।
বিদ্যালয়ে সততা স্টোর ও পরামর্শ বক্স রয়েছে। প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ পরিচ্ছন্ন ও সাজানো-গোছানো। শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলা, গণিত ও ইংরেজি ক্লাব রয়েছে। এসব ক্লাবের মাধ্যমে অলিম্পিয়াড আয়োজনের পাশাপাশি বিজ্ঞান মেলারও আয়োজন করা হয়।
২০২৫ সালে বিদ্যালয়টির ৩৪ শিক্ষার্থী বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৩০ জন বৃত্তি অর্জন করেছে।
পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও নৈতিক শিক্ষা
বিলকিসের উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, গান, ব্যায়াম ও গল্প বলার চর্চাও করানো হয়। প্রতি রোববার বিদ্যালয়ে ‘হ্যাপি সানডে’ পালন করা হয়। শনিবার শিক্ষক ও অভিভাবকদের অংশগ্রহণে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হয়।
শিক্ষার্থীদের বাড়ির কাজের তথ্য অভিভাবকদের কাছে পৌঁছে দিতে শ্রেণিভিত্তিক মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপও ব্যবহার করা হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা স্কুলে কাজ লিখে না নিলেও অভিভাবকেরা তা জানতে পারেন।
প্রধান শিক্ষক নিজেও নিয়মিত সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন এবং বিকেল সাড়ে ৪টায় বাড়ি ফেরেন। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করেন তিনি।
সহকর্মীদের চোখে শৃঙ্খলাপরায়ণ ও উদ্ভাবনী
বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা বলছেন, বিলকিসের নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো শৃঙ্খলা ও সময়ানুবর্তিতা। তিনি শিক্ষাবান্ধব এবং বিদ্যালয়ের সময়ের বাইরেও শিক্ষার্থীদের জন্য সময় দেন।
শিক্ষিকা শামীমা আক্তারের মতে, তার নেতৃত্বে শিক্ষকরা সময়মতো দায়িত্ব পালনে আরও সচেতন হয়েছেন। আরেক শিক্ষিকা মাহামুদা আক্তার বলেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নে বিলকিস নিয়মিত নতুন নতুন পরিকল্পনা করেন এবং শিক্ষকদের নিয়ে সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক সভা করেন।
শিক্ষক কবির হোসেনের ভাষ্য, পাঠদান ও বিদ্যালয় পরিচালনায় বিলকিস অত্যন্ত আন্তরিক। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করেও তিনি শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করেন।
অভিভাবক-শিক্ষার্থীদের আস্থার জায়গা
অভিভাবক কেয়া মৌল্লিক মৌমিতা জানান, প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে প্রবেশের সময় প্রধান শিক্ষক নিজে ফটকে উপস্থিত থাকেন। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, গান, ব্যায়াম ও নৈতিক শিক্ষার প্রতিও তিনি গুরুত্ব দেন। তার নেতৃত্বে বিদ্যালয়ের পরিবেশ আরও সুন্দর হয়েছে।
শিক্ষার্থী ফারাজ ইবনে বশির জানায়, প্রধান শিক্ষক নিয়মিত সারিবদ্ধভাবে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে প্রবেশ করান। ভাষা, বাংলা, গণিত ও ইংরেজি ক্লাবের পাশাপাশি বিদ্যালয়ে ছাদবাগানও রয়েছে। পরিচ্ছন্নতা ও ছাদবাগানের কাজে শিক্ষার্থীরাও অংশ নেয়।
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের স্বীকৃতি
১৯৯৩ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন বি আর বিলকিস। পরে পরীক্ষার মাধ্যমে ২০০৩ সালে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পান তিনি। সোনারগাঁয়ের সাদিপুর ইউনিয়নের কোনাবাড়ি গ্রামে জন্ম নেওয়া বিলকিস পঞ্চমীঘাট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, লালমাটিয়া কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৯৩ থেকে ২০২৬—দীর্ঘ ৩৩ বছরের শিক্ষকতা জীবনে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে একাধিকবার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পর এবার জাতীয় পর্যায়ের সেরার স্বীকৃতি পেলেন তিনি।
নিজের এই অর্জনকে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখছেন না বিলকিস। তার ভাষায়, এ সম্মান বিদ্যালয়ের সব শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সোনারগাঁ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। এই স্বীকৃতি তাকে ভবিষ্যতে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিশুদের মেধা বিকাশে আরও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করবে।
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে গতিশীলতা এবং শিক্ষকদের কাজের প্রতি উৎসাহ বাড়াতে প্রতি বছর বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক দেওয়া হয়। উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের বাছাই শেষে চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করা হয়।
প্রতিবেদকের নাম 
























