হরমুজ প্রণালী ঘিরে চলমান সংকটে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিকল্প বাণিজ্যপথ খুঁজছে তেহরান। তেল রপ্তানি ও জরুরি পণ্য আমদানিতে এবার দেশটির নজর পড়েছে উত্তরের বন্দর ও কাস্পিয়ান সাগরের দিকে।
তবে দক্ষিণের সমুদ্রপথের বিকল্প হিসেবে কাস্পিয়ানকে ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেও সেখানে রয়েছে বড় ধরনের অবকাঠামোগত ও লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা। বিশেষ করে সাগরের পানির স্তর দ্রুত কমে যাওয়ায় বড় জাহাজ চলাচল কঠিন হয়ে পড়ছে।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক ইঙ্গার অ্যান্ডারসেনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০-এর দশক থেকে কাস্পিয়ান সাগরের পানির স্তর প্রায় ২ মিটার কমেছে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে শতাব্দীর শেষ নাগাদ পানির স্তর আরও ৮ থেকে ২১ মিটার কমে যেতে পারে।
ইরানের পরিবেশ বিভাগের কর্মকর্তা শাহরাম ফাদাকারও জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক দুই থেকে তিন বছরে কাস্পিয়ান সাগরের পানির স্তর বছরে ২০ সেন্টিমিটারের বেশি হারে কমছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নৌপরিবহন ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে।
ইরানের শিপিং অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মাসুদ পোলমেহ জানান, কয়েক বছর আগেও দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় বন্দরে প্রায় ৬ হাজার টন ওজনের জাহাজ নোঙর করতে পারত। বর্তমানে পানির গভীরতা কমে যাওয়ায় সেখানে সর্বোচ্চ প্রায় ৪ হাজার টন ওজনের জাহাজ পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে।
শুধু ইরানের উপকূলীয় বন্দরেই নয়, রাশিয়ার ভলগা নদী হয়ে কাস্পিয়ান সাগরে প্রবেশ করা কিছু ইরানি জাহাজও পানির স্বল্পতার কারণে আটকে পড়ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জাহাজগুলোকে চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার জন্য কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
স্থলসীমান্তেও বাড়ছে চাপ
দক্ষিণাঞ্চলীয় সমুদ্রপথে চাপ তৈরি হওয়ায় ইরানকে উত্তরাঞ্চলীয় স্থলসীমান্ত ও পরিবহন ব্যবস্থার ওপরও নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে। কিন্তু সেখানেও দেখা দিয়েছে দীর্ঘ যানজট।
ইরান-রাশিয়া, মধ্য এশিয়া ও ককেশাসবিষয়ক গবেষক ভালি কালেজির তথ্য অনুযায়ী, আর্মেনিয়ার সঙ্গে নোরদুয সীমান্তে প্রায় ১ হাজার ৮০০ ট্রাককে অনেক সময় দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অন্য কয়েকটি সীমান্ত টার্মিনালেও পণ্যবাহী যানকে ইরানে প্রবেশের জন্য ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
তার মতে, বাড়তি চাপের পেছনে শুধু পণ্য পরিবহন বৃদ্ধি নয়; সীমান্ত টার্মিনালের সীমিত সক্ষমতা, কাস্টমস প্রক্রিয়া, সড়ক অবকাঠামো এবং চলমান নির্মাণকাজও দায়ী।
এদিকে ইরানি বিমান সংস্থাগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা ও বিমানপথে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে আর্মেনিয়া ও তুরস্কের সঙ্গে স্থলসীমান্তে যাত্রী চাপও বেড়েছে।
রেল যোগাযোগেও সীমাবদ্ধতা
ইরানের পূর্ব কাস্পিয়ান রেলপথ তুর্কমেনিস্তান, কাজাখস্তান ও চীনের সঙ্গে পণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে দক্ষিণ ককেশাসের সঙ্গে ইরানের রেল যোগাযোগ এখনো পুরোপুরি কার্যকর নয়।
প্রথম নাগর্নো-কারাবাখ যুদ্ধের সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া জুলফা-নাখচিভান রেলপথ পুনরায় চালুর বিষয়টিও আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের শান্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত ‘ট্রিপ’ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ইরানের আঞ্চলিক বাণিজ্য ও ট্রানজিট সক্ষমতা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোর’-এর পশ্চিম অংশে ইরান ও দক্ষিণ ককেশাসের মধ্যে কার্যকর রেল যোগাযোগের অভাব এখনো বড় বাধা। দক্ষিণাঞ্চলীয় সমুদ্রপথে সংকট তৈরি হওয়ায় এই দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
উত্তরের বন্দরগুলোর গুরুত্ব বাড়ছে
ইরানের আনজালি, আমিরাবাদ ও নওশহর বন্দরে ঠিক কত পরিমাণ বাণিজ্য স্থানান্তর হয়েছে, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি। তবে খাদ্যসহ জরুরি পণ্য পরিবহনে এসব বন্দরের গুরুত্ব বাড়ছে।
ইরানের পোর্টস অ্যান্ড মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের প্রধান মোহাম্মদ শাকিতি-নাসাবের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির বন্দরগুলোর মোট নামমাত্র সক্ষমতা প্রায় ৩০ কোটি টন। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর সক্ষমতা প্রায় ৩ কোটি টন।
তবে সাম্প্রতিক সংকটের আগে যে পরিমাণ জরুরি পণ্য উত্তরাঞ্চলীয় বন্দর দিয়ে পরিবহন করা হতো, তার তুলনায় বর্তমানে এই অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অত্যাবশ্যকীয় পণ্য পরিবহনে উত্তরাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর অংশ ১৮ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ হয়েছে।
তবু বড় সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে জাহাজের ধারণক্ষমতায়। দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে যে আকারের জাহাজে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন সম্ভব, কাস্পিয়ান সাগরের বন্দরগুলোতে একই মাত্রার জাহাজ পরিচালনা করা কঠিন।
ফলে হরমুজ প্রণালী ঘিরে সংকট দীর্ঘ হলে কাস্পিয়ান সাগর ও উত্তরাঞ্চলীয় স্থলপথ ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু স্বল্পমেয়াদে দেশের বিশাল বাণিজ্য কাঠামো দক্ষিণ থেকে উত্তরে সরিয়ে নেওয়া তেহরানের জন্য সহজ হবে না।
প্রতিবেদকের নাম 

























