বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল, ১১ দলীয় জোটে অলি আহমদ
৩৫ বছর পর আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে। সংসদ সদস্যরা গোপন ব্যালটে ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করবেন।
১৯৯১ সালের পর এই প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন একক প্রার্থীর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হচ্ছে না। সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল
রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে চূড়ান্ত করেছে বিএনপি। দলটির একাধিক স্থায়ী কমিটির সদস্য গতকাল রোববার এ তথ্য জানিয়েছেন।
তারা জানান, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাষ্ট্রপতি পদে দলের প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুলকে চূড়ান্ত করেছেন। আগামী ১২ আগস্ট এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে গত ১ আগস্ট বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে মির্জা ফখরুল জানিয়েছিলেন, রাষ্ট্রপতি প্রার্থী নির্বাচন ও সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে।
এদিকে গতকাল চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি ও দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন।
১১ দলীয় জোটের প্রার্থী অলি আহমদ
অন্যদিকে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে।
রোববার রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
এর আগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে অলি আহমদকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
যেভাবে হবে ভোট
জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে স্পিকার বা রিটার্নিং কর্মকর্তার উপস্থিতিতে নির্ধারিত পোলিং বুথ স্থাপন করা হবে। সংসদ সদস্যরা গোপন ব্যালট পেপারে পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিয়ে তা নির্ধারিত ব্যালট বাক্সে জমা দেবেন।
ভোটগ্রহণ শেষে ব্যালট গণনা করে ফলাফল প্রকাশ করা হবে।
রাষ্ট্রপতির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে ইতোমধ্যে ছয়টি পৃথক কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাস
স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতিতে একাধিকবার পরিবর্তন এসেছে। কখনো সংসদ সদস্যদের ভোটে, কখনো সরাসরি জনগণের ভোটে এবং কখনো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন।
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে। তিনি পাকিস্তানে বন্দি থাকায় সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭২ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা চালুর পর বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৭৩ সালের ১০ এপ্রিল সংসদ সদস্যদের ভোটে তিনি পুনর্নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তার পদত্যাগের পর ১৯৭৪ সালে মোহাম্মদ মুহম্মদুল্লাহ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি হন।
১৯৭৫ সালের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু করা হয়। এরপর রাজনৈতিক ও সামরিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক পরিবর্তন আসে।
সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
১৯৭৮ সালে প্রথমবারের মতো দেশের সাধারণ ভোটাররা সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেন। ওই নির্বাচনে জিয়াউর রহমান জয়ী হন। ১৯৮১ সালে তার হত্যাকাণ্ডের পর অনুষ্ঠিত সরাসরি নির্বাচনে বিএনপির আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
এরশাদ আমলেও সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবরের নির্বাচনে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জয়ী হন। এটিই ছিল দেশের সর্বশেষ সরাসরি জনভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।
১৯৯১ সালের পর সংসদ সদস্যদের ভোট
১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ আবার সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যায়। এরপর সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু হয়।
১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর সংসদ সদস্যদের ভোটে আওয়ামী লীগ মনোনীত সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে পরাজিত করে বিএনপি মনোনীত আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এটিই ছিল সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।
এরপর ১৯৯৬ সালে সাহাবুদ্দীন আহমদ, ২০০২ সালে ইয়াজউদ্দিন আহমেদ, ২০০৯ সালে জিল্লুর রহমান, ২০১৩ ও ২০১৮ সালে আবদুল হামিদ এবং ২০২৩ সালে মো. সাহাবুদ্দিন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
এবার নতুন করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা
২০২৬ সালের ২৪ জুলাই স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেন। এরপর সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
আগামী ২০ আগস্টের নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও অলি আহমদের মতো দুই রাজনৈতিকভাবে পরিচিত প্রার্থী থাকায় ৩৫ বছর পর আবারও সংসদ সদস্যদের সরাসরি গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদকের নাম 




















