ঢাকায় তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ২ লাখ ৪৯ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। একই সভায় নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে দেশের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর জন্য ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন ব্যবস্থা স্থাপনের প্রকল্পও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বুধবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় মোট ১২টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে সাতটি নতুন এবং পাঁচটি সংশোধিত প্রকল্প।
তিন মেট্রোরেল প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে জাপানের অর্থায়নে এমআরটি লাইন-১ (বিমানবন্দর-কমলাপুর), এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন রুট (হেমায়েতপুর-ভাটারা) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ অর্থায়নে এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন রুট (গাবতলী-দাশেরকান্দি)।
জাপানের অর্থায়নে ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-১ বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন প্রকল্পে ব্যয় হবে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। আর ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা।
দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল হিসেবে এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাবও অনুমোদন করা হয়েছে। প্রকল্পটির ব্যয় ১১৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ বাড়ছে। ২০৩৩ সালের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন রুট গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার অংশ হবে পাতালপথে। হাতিরঝিল এলাকায় টানেলের মাধ্যমে লাইন নির্মাণ করা হবে এবং আফতাবনগর থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত অংশ উড়ালপথে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয়ের মধ্যে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা সরকারি অর্থায়ন এবং বাকি ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা এডিবি ও দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়ন সহায়তা তহবিল থেকে আসবে।
নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুরে চলবে বৈদ্যুতিক ট্রেন
দেশে প্রথমবারের মতো বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর উদ্যোগ হিসেবে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রেলপথে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন ব্যবস্থা স্থাপনের প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে একনেক।
৫২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন বা ওভারহেড ক্যাটেনারি ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকা। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় পাঁচ কোচের ১৬ সেট ইলেকট্রিক মালটিপল ইউনিট (ইএমইউ) সংগ্রহ করা হবে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক ট্রেন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জয়দেবপুরে আধুনিক ওয়ার্কশপ নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক অবকাঠামো স্থাপন করা হবে।
মোট ব্যয়ের মধ্যে ৯৪২ কোটি ৯ লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে এবং ২ হাজার ৮৮০ কোটি ৪২ লাখ টাকা এডিবি ও ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (ইআইবি) প্রকল্প ঋণ থেকে জোগানের পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ব্যস্ত নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর করিডোরে রেল পরিবহনের সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে ডিজেলনির্ভরতা কমার পাশাপাশি জ্বালানি ব্যয় ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
ব্যয় বাড়ার কারণ জানালেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী
মেট্রোরেলের দুটি প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, প্রকল্পের কাজের পরিধি ও স্কোপ ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর বিভিন্ন স্থানে স্টেশনের অবস্থান পরিবর্তনসহ প্রকল্পের বিভিন্ন অংশের পরিধি বেড়েছে। এতে নির্মাণ ব্যয়ও বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের ঋণ জাপানি মুদ্রা ইয়েনে হলেও ডলারের বিপরীতে ইয়েনের মূল্যমান, মূল্যস্ফীতি, শ্রম ব্যয় এবং ভ্যাট-ট্যাক্স বৃদ্ধিও ব্যয় বাড়ার কারণ। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে ঋণের সুদহারে। প্রকল্পের শুরুতে জাইকার ঋণের সুদহার ছিল শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ, যা বর্তমানে বেড়ে ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ হয়েছে।
প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, কমিটি প্রকল্পের অর্থায়ন, প্রযুক্তি, ব্যয় বৃদ্ধি ও অন্যান্য বিষয় পর্যালোচনা করে। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই সংশোধিত প্রকল্প একনেকে উপস্থাপন করা হয়েছে।
একনেকে অনুমোদন ১২ প্রকল্প
একনেক সভায় মোট ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়সংবলিত ১২টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৪৮ হাজার ২৫৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার ৪৬৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা জোগান দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে পাঁচটি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের। এর মধ্যে রয়েছে মেট্রোরেলের লাইন-৫ সাউদার্ন ও নর্দার্ন রুট এবং লাইন-১-এর প্রথম সংশোধিত প্রকল্প।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন বাস্তবায়ন এবং বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণের প্রথম সংশোধিত প্রকল্প।
এ ছাড়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুটি, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের একটি, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের একটি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে।
প্রতিবেদকের নাম 




















