নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে সোনালী ব্যাংকের এক নৈশপ্রহরীর বিরুদ্ধে গ্রাহকদের প্রায় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের পর গত ২০ জুলাই থেকে ব্যাংকে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন নৈশপ্রহরী ফিরোজ মিয়া। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর ব্যাংকটির গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন আমানতকারী তাঁদের হিসাবে টাকা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কয়েকজন গ্রাহককে ইতোমধ্যে ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংক সূত্র ও গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ইসমাইল গ্রামের কছির উদ্দিনের ছেলে ফিরোজ মিয়া প্রায় ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে সোনালী ব্যাংকের কিশোরগঞ্জ শাখায় নৈশপ্রহরী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘদিন ব্যাংকে কাজ করার সুবাদে গ্রাহকদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
অভিযোগ রয়েছে, নৈশপ্রহরীর দায়িত্বের বাইরে গিয়ে ফিরোজ ব্যাংকের গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট খোলা, ঋণের কাগজপত্র প্রস্তুত, টাকা জমা ও উত্তোলনসহ বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করতেন। এতে অনেক গ্রাহকের কাছে তিনি ব্যাংকের বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
গ্রাহকদের অভিযোগ, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ফিরোজ বিভিন্ন সময় তাঁদের কাছ থেকে চেকের পাতা, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, স্ট্যাম্প ও ছবি নিয়ে রাখতেন। পরে এসব কাগজপত্র ব্যবহার করে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন গ্রাহক।
ব্যাংকের গ্রাহক ছাদিকুল মিয়া অভিযোগ করেন, ঋণ নিতে গেলে ফিরোজের সঙ্গে যোগাযোগ করলেই কাজ সহজ হতো। তাঁর দাবি, ফিরোজ বিভিন্ন গ্রাহকের ঋণ করে দেওয়ার কথা বলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতেন। পরে ঋণের পরিমাণের বিষয়ে গ্রাহকরা জানতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
আরেক গ্রাহক তহুরা বেগম জানান, তিনি সোনালী ব্যাংকের কিশোরগঞ্জ শাখায় এফডিআর করেছিলেন। মেয়াদ শেষে টাকা তুলতে গেলে ফিরোজ তাঁকে চেকবই দিয়ে যেতে বলেন এবং কয়েক দিন পর টাকা দেওয়ার কথা জানান। পরে ব্যাংকে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, তাঁর অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নেই। বিষয়টি ব্যাংক ব্যবস্থাপককে জানালে তিনি টাকা ফেরতের দায়িত্ব নেন বলে জানান তহুরা।
গ্রাহক আরজিনা বেগমের অভিযোগ, তিনি একটি মাদ্রাসায় চাকরি করেন। তাঁর বেতনের ২৮ হাজার টাকা ফিরোজ তুলে নিয়েছেন।
এদিকে ফিরোজের বাবা কছির উদ্দিন দাবি করেছেন, তাঁর ছেলে ব্যাংকের কয়েকজন গ্রাহকের টাকা তুলে নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গাড়াগ্রামের তহুরা বেগমসহ কয়েকজন গ্রাহকের মোট ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যাংক ব্যবস্থাপক পংকজ কান্তি রায়ের মাধ্যমে ফেরত দেওয়া হয়েছে। তবে তাঁর ছেলে আরও কত টাকা নিয়েছেন, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তবে শুনেছেন, সব মিলিয়ে টাকার পরিমাণ প্রায় এক কোটি।
কিশোরগঞ্জ সোনালী ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপক পংকজ কান্তি রায় বলেন, গত ২০ জুলাই থেকে ফিরোজ হঠাৎ ব্যাংকে আসা বন্ধ করে দেন। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছিলেন, জরুরি কাজে তিনি ঢাকায় গেছেন। তাঁর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে তাঁর বাড়িতে নোটিশ পাঠানো হয়।
ব্যবস্থাপক আরও বলেন, বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ১০ থেকে ১৫ জন আমানতকারী ব্যাংকে এসে তাঁদের হিসাবে টাকা না থাকার অভিযোগ করেন। ইতোমধ্যে কয়েকজন গ্রাহককে ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ থানায় জিডি করেছে। কিশোরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল গফুর মিয়া বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ব্যাংকের নৈশপ্রহরী ফিরোজ মিয়া গত ২০ জুলাই থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁর নিখোঁজের ঘটনায় ব্যাংক ব্যবস্থাপক একটি জিডি করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে ফিরোজ মিয়ার বক্তব্য জানতে একাধিকবার তাঁর মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া গেছে। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনার প্রকৃত রহস্য, আত্মসাতের টাকার পরিমাণ এবং এর সঙ্গে ব্যাংকের অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না—তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
প্রতিবেদকের নাম 




















