নুসরাত জাহান (স্মরনীকা):
একটি গাছের শিকড় শুকিয়ে গেলে বাহ্যিক সবুজে তাকে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা যায় না। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। যখন দুর্নীতি, বৈষম্য, জবাবদিহির অভাব এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রাষ্ট্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়, তখন পরিবর্তনের দাবিতে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম রাজপথে নেমে আসে। বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন দেশে সরকারবিরোধী আন্দোলনের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তার পেছনেও রয়েছে এই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।
বাংলাদেশ, নেপাল এবং লাতিন আমেরিকার দেশ পেরু—ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভিন্ন হলেও একটি জায়গায় তারা একই সূত্রে আবদ্ধ। তিন দেশেই বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের, বিশেষ করে তরুণদের, অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক অচলাবস্থা, অর্থনৈতিক চাপ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিকে কেন্দ্র করে তরুণদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে রাজপথ—সবখানেই পরিবর্তনের প্রত্যাশা দৃশ্যমান। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়েও ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্দোলনে তরুণদের সক্রিয় ভূমিকা তাদের ন্যায়বিচার ও অধিকারবোধের পরিচয় বহন করে।
অন্যদিকে নেপালে ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দুর্নীতির কারণে সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের আস্থা কমেছে। তরুণরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সংগঠনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে জবাবদিহিমূলক রাজনীতির দাবি তুলছে।
পেরুতেও একই ধরনের অসন্তোষ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আন্দিয়ান অঞ্চলের কৃষক, শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় সুবিধা রাজধানীকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। ফলে তারা সড়ক ও বিমানবন্দর অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।
এই আন্দোলনগুলোর পেছনে কয়েকটি অভিন্ন কারণ স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে দুর্নীতি, রাজনৈতিক জবাবদিহির অভাব, অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব, দুর্বল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের ঘাটতি। পাশাপাশি উন্নয়নের অসম বণ্টনও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি করছে।
বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির বিস্তারও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে এক দেশের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা অন্য দেশের তরুণদের অনুপ্রাণিত করছে। ফলে পরিবর্তনের দাবি এখন শুধু স্থানীয় নয়, বরং বৈশ্বিক বাস্তবতায়ও পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল আন্দোলন দমন করে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বরং সংকটের মূল কারণগুলো সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, আইনের শাসন নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং অঞ্চলভিত্তিক সমতাভিত্তিক উন্নয়ন।
একই সঙ্গে রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের সুযোগ বাড়ানোও সময়ের দাবি। তরুণদের চিন্তা, উদ্ভাবনী শক্তি ও নেতৃত্বের বিকাশ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
বাংলাদেশ, নেপাল কিংবা পেরুর আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও তাদের বার্তা প্রায় একই—বৈষম্য, দুর্নীতি ও একচেটিয়া ক্ষমতার পরিবর্তে ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সমান সুযোগভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা। বর্তমান প্রজন্ম শুধু অর্থনৈতিক নিরাপত্তাই নয়, বরং গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং মানবিক মর্যাদাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
এই বাস্তবতা ইঙ্গিত দেয়, তরুণদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দিয়ে অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে ভবিষ্যতে অসন্তোষ আরও গভীর হতে পারে।
প্রতিবেদকের নাম 




















