দুর্গাপূজার ছুটিতে পর্যটকদের পদচারণে মুখর থাকার কথা ছিল রাঙামাটির বাঘাইছড়ির সাজেক পর্যটনকেন্দ্র। কিন্তু প্রশাসনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও নতুন করে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের ঘোষণায় সাজেক কবে খুলবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। এতে বিপাকে পড়েছেন রিসোর্ট, কটেজ, পরিবহন ও রেস্তোরাঁ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা। বাতিল হচ্ছে আগাম বুকিং, বাড়ছে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা।
রিসোর্ট ও কটেজ মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্গাপূজার ছুটি ঘিরে ১৬ থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত সাজেকের অধিকাংশ রিসোর্ট ও কটেজের কক্ষ আগাম বুকিং দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর অবরোধের ঘোষণার পর পর্যটকেরা বুকিং বাতিল করতে শুরু করেছেন। পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের লোকসানের আশঙ্কা আরও বাড়ছে।
সাজেক জুমঘর রিসোর্টের ব্যবস্থাপক লিগা রায় ত্রিপুরা প্রথম আলোকে বলেন, প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার পর সাজেক এখন পর্যটকশূন্য। পূজার ছুটিতে তাঁদের রিসোর্টের সব কক্ষ বুকিং থাকলেও পর্যটকেরা এখন তা বাতিল করছেন। পর্যটনের মূল মৌসুমে এমন পরিস্থিতিতে তাঁদের বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।
সাজেক খোয়াল বুক রিসোর্টের ব্যবস্থাপক সমিরন চাকমা জানান, তাঁদের রিসোর্টেরও সব কক্ষ আগাম বুকিং ছিল। নিষেধাজ্ঞার কারণে পর্যটকেরা বুকিং বাতিল করায় প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে।
সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সভাপতি ও রাঙামাটি জেলা পরিষদের সদস্য সুপর্ণ দেব বর্মণ বলেন, সাজেকের পর্যটনের সঙ্গে বহু মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার কারণে সাধারণ মানুষ জীবিকা নিয়ে সংকটে পড়েছেন। দ্রুত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই খুলবে সাজেক: জেলা প্রশাসক
সাজেকে পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধের বিষয়ে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সাজেক পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই দ্রুত পর্যটনকেন্দ্রটি খুলে দেওয়া হবে।
এর আগে গত রোববার সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি নামের দুটি সংগঠন সড়ক অবরোধ শুরু করে। সংগঠন দুটির অভিযোগ, এলাকায় সশস্ত্র তৎপরতা চালানোর পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের হুমকি ও ভয়ভীতি দেখাচ্ছে জেএসএস (সন্তু লারমা)।
তাদের দাবি, এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সমাবেশের মাধ্যমে প্রশাসনকে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এর প্রতিবাদে সড়ক অবরোধের কর্মসূচি দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, জেএসএস এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দলটির দাবি, ইউপিডিএফের চাপে সংগঠন দুটি অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
জেএসএসের প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, সাজেকে সাধারণ মানুষের ওপর ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের নিপীড়ন ও হয়রানির ঘটনা আড়াল করতেই তাঁদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
অবরোধের কারণে গত রোববার পর্যটকবাহী কয়েকটি যানবাহন সাজেকে আটকা পড়ে। পরে ওই দিন সন্ধ্যায় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সাজেক পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকদের যাতায়াত সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে জেলা প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার থেকে ফের অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ঘোষণা
প্রশাসনের দেওয়া আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ার অভিযোগ তুলে বৃহস্পতিবার থেকে সাজেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন।
বুধবার দুই সংগঠনের যৌথ বিবৃতিতে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা এবং সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা।
বিবৃতিতে বলা হয়, সাজেকের মাচলঙ এলাকায় জেএসএস (সন্তু লারমা) গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়াসহ তিন দফা দাবিতে গত ১১ অক্টোবর পর্যটন সড়কে অবরোধ করা হয়েছিল। পরে প্রশাসন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাস দিলে কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও দাবিগুলো পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ সংগঠন দুটির।
বিবৃতিতে আরও অভিযোগ করা হয়, জেএসএসের সশস্ত্র সদস্যরা মাচলঙ এলাকার থালকুম্ভো, চিল্ল্যাতুলি, নোয়াপাড়া, লাম্বাবাক ও ভুয়োছড়িতে সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছেন এবং সাধারণ গ্রামবাসীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। দাবি পূরণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে বলে জানিয়েছে সংগঠন দুটি।
২৪ ঘণ্টার মধ্যে সাজেক খোলার দাবি ব্যবসায়ী-শ্রমিকদের
এদিকে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেওয়া ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে খাগড়াছড়ি শহরে মানববন্ধন করেছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও শ্রমিকেরা।
বুধবার সকালে শহরের শাপলা চত্বরে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, দুই আঞ্চলিক সংগঠনের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় পাহাড়ের পর্যটন অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হোটেল, রিসোর্ট, পরিবহন ও রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী এবং শ্রমিকেরা আর্থিক সংকটে পড়ছেন।
যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি আয়ুস চাকমা বলেন, সাজেকের পর্যটন খাতের সঙ্গে বহু শ্রমিকের কর্মসংস্থান জড়িত। তাঁরা দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ। এক দিন কাজ না থাকলেও তাঁদের পরিবারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই দ্রুত পর্যটনকেন্দ্রটি খুলে দেওয়া প্রয়োজন।
জেলা কটেজ অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা জন বলেন, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা না করে বারবার পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসা গড়ে তুলেছেন। তাঁদের অনেকেই ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। দ্রুত সাজেক খুলে দেওয়া না হলে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবেন বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
ই-ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ইটাব) সদস্য উজ্জ্বল দে বলেন, দুর্গাপূজার ছুটিতে সাজেকের বিভিন্ন রিসোর্ট ও কটেজে আগাম বুকিং ছিল। নিষেধাজ্ঞার কারণে পর্যটকেরা যেতে না পারলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হবে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সাজেক খুলে দেওয়া না হলে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
পূজার ছুটিতে সাজেক ভ্রমণ নিয়ে অনিশ্চয়তা
দুর্গাপূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে সাজেকে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগমের প্রত্যাশা থাকলেও নিরাপত্তা পরিস্থিতি, প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের ঘোষণায় সেই সম্ভাবনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পর্যটনকেন্দ্রটি খুলে দেওয়া হবে।
তবে বৃহস্পতিবার থেকে নতুন করে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু হলে সাজেকে পর্যটকদের যাতায়াত আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হতে পারে। ফলে পূজার ছুটিতে সাজেক ভ্রমণের পরিকল্পনা করা পর্যটকদের পাশাপাশি পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদেরও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হচ্ছে। এখন তাঁদের অপেক্ষা—কবে কাটবে নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের অনিশ্চয়তা, কবে আবার পর্যটকদের পদচারণে মুখর হবে সাজেক।
খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি প্রতিনিধি 























