সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করতে সরকারের আরও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, পে-স্কেল নিয়ে সিদ্ধান্ত যত দীর্ঘায়িত হবে, পরিস্থিতি ততই জটিল হয়ে উঠবে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে আয়োজিত ‘সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রমের ওপর মূল্যায়ন’ শীর্ষক এক মিডিয়া সংলাপে এসব কথা বলা হয়। অনুষ্ঠানে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, আরেক সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া উদ্বেগের বিষয়। তাঁর মতে, সরকারকে এ বিষয়ে দ্রুত একটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তে আসতে হবে।
রাজস্ব ঘাটতিই বড় বাধা
পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের দীর্ঘসূত্রিতার অন্যতম কারণ হিসেবে রাজস্ব ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরেন দেবপ্রিয়। তিনি জানান, চলতি অর্থবছরে সরকারের ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর বিপরীতে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ ধরনের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছে সিপিডি।
দেবপ্রিয় বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত বেতন কাঠামোসংক্রান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছিল। তাঁর মতে, শুরুতেই যদি ২০ থেকে ২৫ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হতো, তাহলে সরকারকে কিছুটা সময় নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতো।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বেতন-ভাতার বিষয়টি দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখলে এর প্রভাব সরকারের অন্যান্য কার্যক্রমেও পড়তে পারে।
ছয় মাসে ৯৫ কারখানা বন্ধ
সরকারের গত ছয় মাসের কার্যক্রম মূল্যায়ন করতে গিয়ে দেশের শিল্প খাতের পরিস্থিতিও তুলে ধরে সিপিডি।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের প্রধান তিনটি শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন শ্রমিক।
সিপিডির মতে, শিল্প খাতে এমন পরিস্থিতি কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে তথ্যের ঘাটতি
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশ কিছু কাঠামোগত সমস্যা ও বৈশ্বিক সংকটের মুখোমুখি ছিল। তবে দায়িত্ব গ্রহণের সময়কার অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি সমন্বিত তথ্যভিত্তিক হোয়াইট পেপার তৈরি না হওয়ায় বর্তমানে সরকারের অগ্রগতি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন হচ্ছে।
তিনি বলেন, শুরুতে একটি নির্ভরযোগ্য ভিত্তিচিত্র তৈরি করা গেলে সরকারের পরবর্তী সময়ে অর্জন ও সীমাবদ্ধতা তুলনা করে দেখা আরও সহজ হতো।
৩৬২ উদ্যোগ পর্যবেক্ষণ করছে সিপিডি
সরকারের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি, সংস্কার উদ্যোগ ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য সিপিডি ৩৬২টি পদক্ষেপ নিয়ে একটি তালিকা তৈরি করেছে। এসব উদ্যোগকে ৯টি ভাগে বিভক্ত করে ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’-এর মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সুশাসনের ক্ষেত্রে মোট ১০৫টি ঘটনা মূল্যায়নের আওতায় রাখা হয়েছে।
এর মধ্যে সরকারি এমপিদের প্লট ও গাড়ি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে সিপিডি।
তবে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধাভিত্তিক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি বলেও উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি।
সব মিলিয়ে সিপিডির মূল্যায়ন হলো, পে-স্কেলসহ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া, রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলা এবং সংস্কার কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রতিবেদকের নাম 



















