বরিশালের বাবুগঞ্জের তরুণ শিক্ষার্থী রাকিব হোসাইন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের শেষ মুহূর্তে ফেসবুকে ‘বিজয় অথবা শহীদ’ শিরোনামের একটি পোস্ট শেয়ার করেছিলেন। এর কিছুক্ষণ পরই সহপাঠীদের সঙ্গে মিছিলে অংশ নিয়ে ঢাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিনি। গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে স্বজন, সহপাঠী ও এলাকাবাসী গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছেন এই তরুণকে।
রাকিব বাবুগঞ্জ উপজেলার মানিককাঠি গ্রামের কৃষক আলমগীর হোসেনের ছোট ছেলে। পরিবারের সদস্যরা জানান, দুই বছর পেরিয়ে গেলেও অসুস্থ মা এখনও বিশ্বাস করেন, একদিন ছেলে ফিরে আসবে। আর বাবা প্রতিদিন ছেলের কবরের পাশে গিয়ে নীরবে সময় কাটান।
পরিবার ও সহপাঠীদের তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদের ‘বিজয় অথবা শহীদ’ শিরোনামের ফেসবুক পোস্ট নিজের অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেন রাকিব। এর আগে তিনি নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আব্দুল্লাহ ও আসিফ মাহমুদসহ আন্দোলনের নেতাদের ছবি পোস্ট করে লিখেছিলেন, ‘আজ যুদ্ধে যাচ্ছে বাংলাদেশ।’

এরপর প্রবল বৃষ্টির মধ্যেই প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীর একটি মিছিলে যোগ দেন তিনি। মিছিলটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের উদ্দেশে রওনা হলে সকাল প্রায় ১১টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে পৌঁছায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে রাকিবের বড় ভাই আবুল কালাম জানান, সেখানে পুলিশ গুলি চালালে সামনের সারিতে থাকা রাকিব গুলিবিদ্ধ হন। সহপাঠীরা দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। পরদিন বাবুগঞ্জে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় তাকে।
আবুল কালাম জানান, পুলিশের ছোড়া দুটি গুলি রাকিবের পেটে লাগে। এর মধ্যে একটি গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায়।
রাকিব বাবুগঞ্জের খানপুরা আলিম মাদরাসা থেকে দাখিল এবং বরিশালের ইনফ্রা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন। পরে তিনি সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দশম ব্যাচে বিএসসি অধ্যয়নরত ছিলেন।
সহপাঠী হাসানুল বান্না বলেন, রাকিব শুরু থেকেই কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন মেধাবী, সাহসী ও প্রতিবাদী। প্রায়ই মিছিলের সামনের সারিতে থাকতেন এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আবদুস সালাম বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী তরুণ হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিলেন রাকিব। কৃষক বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত করে প্রতিষ্ঠিত করা, কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি।
রাকিবের বাবা আলমগীর হোসেন বলেন, অনেক কষ্ট করে ছেলেকে পড়াশোনা করিয়েছিলেন। আশা ছিল লেখাপড়া শেষ করে একদিন সংসারের দায়িত্ব নেবে। কিন্তু ঘরে ফিরেছে শুধু তার নিথর দেহ। তিনি আরও জানান, আন্দোলনের সময় বড় ছেলের চাকরিও চলে গেছে। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা উল হুসনা জানান, উপজেলা প্রশাসন নিয়মিত শহীদ পরিবারগুলোর খোঁজখবর রাখছে। রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে তাদের সম্মান জানানো হয়। পাশাপাশি রাস্তা নির্মাণ, টিউবওয়েল স্থাপনসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।
দ্বিতীয় শাহাদাতবার্ষিকীতে রাকিবকে স্মরণ করে স্বজন ও সহপাঠীরা বলেন, স্বপ্নবাজ এই তরুণের আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মকে অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা জোগাবে।
প্রতিবেদকের নাম 



















