দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারের গর্ভবতী মায়েদের গর্ভকালীন সহায়তা ও শিশুর লালনপালনে সহযোগিতা দিতে ২০১১ সাল থেকে মাতৃত্বকালীন ভাতা চালু করেছে সরকার। বর্তমানে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’র আওতায় এই সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
শুধু আর্থিক সহায়তা দেওয়া নয়, গর্ভবতী মা ও শিশুর পুষ্টি, স্বাস্থ্য, যত্ন এবং শিশুর প্রাথমিক বিকাশে সহায়তা করাও এই কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য। তবে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলেই কেবল ভাতার জন্য আবেদন করা যায়।
মাসে কত টাকা পাওয়া যায়
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’র মাসিক ভাতার পরিমাণ ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ টাকা করা হয়েছে।
নির্বাচিত উপকারভোগীরা সর্বোচ্চ ৩৬ মাস পর্যন্ত এই সহায়তা পেতে পারেন। পুরো ৩৬ মাস মাসে ৮৫০ টাকা করে পেলে একজন উপকারভোগী মোট ৩০ হাজার ৬০০ টাকা পাবেন।
বর্তমানে প্রথম ও দ্বিতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী দরিদ্র পরিবারের গর্ভবতী মায়াদের এই কর্মসূচির আওতায় নেওয়া হয়।
কারা ভাতা পাওয়ার যোগ্য
মাতৃত্বকালীন ভাতার জন্য সাধারণভাবে যেসব শর্ত পূরণ করতে হয়—
- আবেদনকারীর বয়স ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে হতে হবে।
- জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) থাকতে হবে। জন্মসনদ দিয়ে আবেদন করা যাবে না।
- প্রথম অথবা দ্বিতীয় গর্ভাবস্থায় আবেদন করা যাবে। তৃতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে আবেদন করা যাবে না।
- নিজের নামে সচল মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যাংক হিসাব থাকতে হবে। যেমন—বিকাশ, নগদ ইত্যাদি।
- পরিবারের মাসিক আয় সর্বোচ্চ ৮ হাজার টাকা হতে হবে।
- আবেদনকারীকে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের এলাকার নাগরিক/ভোটার হতে হবে।
এ ছাড়া স্থানীয় সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী আবেদনের সময় নির্দিষ্ট সময়ের গর্ভাবস্থায় থাকার শর্ত থাকতে পারে। তাই শুধু গর্ভবতী হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাতা পাওয়া যায় না। আবেদনকারীর যোগ্যতা, স্থানীয় বরাদ্দ এবং যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে চূড়ান্তভাবে উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়।
অনলাইনে আবেদন করবেন যেভাবে
মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’র MIS পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন করা যায়।
প্রথমে নির্ধারিত সরকারি অনলাইন আবেদন পোর্টালে প্রবেশ করে ‘নতুন আবেদন’ অপশন নির্বাচন করতে হবে। এরপর জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ ও নিজের সচল মোবাইল নম্বর দিয়ে আবেদন ফরম খুলতে হবে।
ফরমে নাম, ঠিকানা, গর্ভাবস্থার তথ্য, সন্তানের তথ্য এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থাসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় ছবি ও স্বাক্ষর আপলোড করে সব তথ্য ভালোভাবে যাচাই করে আবেদন জমা দিতে হবে।
নিজে অনলাইনে আবেদন করার পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদ বা উপজেলা পর্যায়ের উদ্যোক্তার সহায়তাতেও আবেদন করা যায়।
পাশাপাশি ছবি ও স্বাক্ষর আপলোড করতে হবে। আবেদন গ্রহণের সময়সীমা প্রতি মাসের ১ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত।
আবেদন ফর্মটি ডাউনলোড করুন এই লিংকে
কোথা থেকে আবেদন করবেন
আবেদনকারী যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের এলাকার নাগরিক বা ভোটার, সাধারণত সেখান থেকেই আবেদন করতে হয়।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাতৃত্বকালীন ভাতার নামে বিভিন্ন অনলাইন লিংক ছড়িয়ে পড়তে পারে। এসব লিংকে NID বা ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার আগে সেটি সরকারি ওয়েবসাইট কি না নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
সরকারি কর্মসূচির সর্বশেষ তথ্য জানতে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কার্যালয় এবং উপজেলা বা জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ে যোগাযোগ করাই নিরাপদ।
আবেদন করলেই কি ভাতা নিশ্চিত?
না। অনলাইনে আবেদন করলেই কেউ সরাসরি ভাতাভোগী হয়ে যান না।
মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের MIS ব্যবস্থায় আবেদন গ্রহণের পর প্রাথমিক বাছাই, তথ্য যাচাই, ডাবল-ডিপিং যাচাই, অগ্রাধিকার নির্ধারণ, মাঠপর্যায়ে যাচাই এবং চূড়ান্ত বাছাইয়ের মতো ধাপ রয়েছে। এসব প্রক্রিয়া শেষে যোগ্য ব্যক্তিদের ভাতাভোগী হিসেবে নির্বাচন করা হয়।
ভাতার টাকা পাবেন যেভাবে
বর্তমান ব্যবস্থায় নির্বাচিত উপকারভোগীর নিজস্ব আর্থিক হিসাবে ভাতার অর্থ পাঠানো হয়। এজন্য নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে নিবন্ধিত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) বা ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ।
অন্য কারও মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট ব্যবহার না করে নিজের NID-সংযুক্ত MFS বা ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করাই নিরাপদ।
আবেদনের সময়সীমা
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসের ১ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত আবেদন গ্রহণ করা হয়। আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কার্যালয় থেকে চলতি সময়ের আবেদন গ্রহণ ও যাচাই-বাছাইয়ের নিয়ম জেনে নেওয়া ভালো।
যেসব তথ্য ও কাগজপত্র প্রস্তুত রাখবেন
আবেদনের সময় প্রয়োজন হতে পারে—
- জাতীয় পরিচয়পত্র
- সচল মোবাইল নম্বর
- নিজের নামে NID-সংযুক্ত MFS বা ব্যাংক হিসাবের তথ্য
- ঠিকানা ও পারিবারিক তথ্য
- গর্ভাবস্থার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা/মেডিকেল তথ্য
- ছবি ও স্বাক্ষর
- পরিবারের আয়-সংক্রান্ত তথ্য
আবেদনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত কোনো তথ্য বা কাগজপত্র চাইলে তা দিতে হতে পারে।
আবেদনের অবস্থা জানবেন যেভাবে
আবেদন করার পর ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা থেকে আবেদনের অবস্থা জানা যায়। জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে সিস্টেমে আবেদনটি বাতিল, গ্রহণযোগ্য, সুপারিশকৃত বা অনুমোদিত হয়েছে কি না যাচাই করা যেতে পারে।
এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ইউপি উদ্যোক্তা বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির সহায়তা নেওয়া যায়।
প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকুন
মাতৃত্বকালীন ভাতার আবেদন করে দেওয়ার কথা বলে কেউ টাকা চাইলে বা ভাতা নিশ্চিত করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে সতর্ক থাকতে হবে।
কেউ যদি—
- OTP চায়;
- NID-এর ছবি বা তথ্য নিজের ফোনে রাখতে চায়;
- নিজের MFS অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে বলে;
- ভাতা পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে টাকা দাবি করে;
তাহলে তার সঙ্গে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করাই নিরাপদ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের ডিসেম্বর মাসে ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’র আওতায় ১৬ লাখ ৪১ হাজার ৬৪৯ জন উপকারভোগীকে অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যের উল্লেখ রয়েছে।
তাই আবেদন করার আগে নিজের যোগ্যতা যাচাই করে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করা এবং প্রয়োজন হলে স্থানীয় মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে তথ্য নিশ্চিত করাই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।অগ্রাধিকার এবং সুপারিশ প্রক্রিয়া (উদ্যোক্তা) পিডিএফ ডাউনলোড

মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট
প্রতিবেদকের নাম 




















