রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয় হঠাৎ মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি সি-১৭ গ্লোবমাস্টার পরিবহন বিমান অবতরণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেখানে গোপন সফরে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএসের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
মস্কোর ভনুকোভো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওই বিমান অবতরণের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য নেই বলে জানিয়েছিল ক্রেমলিন। এর কয়েক ঘণ্টা পরই র্যাটক্লিফের মস্কো সফরের খবর সামনে আসে।
তবে র্যাটক্লিফের সফরের উদ্দেশ্য কী, কিংবা রাশিয়ার কোন কর্মকর্তার সঙ্গে তিনি বৈঠক করবেন—এ বিষয়ে ওয়াশিংটন বা মস্কোর পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। দুই দেশের মধ্যে বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এমন উচ্চপর্যায়ের সরাসরি যোগাযোগকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফ্লাইট ট্র্যাকিংয়েও মিলেছে সফরের ইঙ্গিত
ফ্লাইট ট্র্যাকিংয়ের তথ্যেও র্যাটক্লিফের সম্ভাব্য সফর সম্পর্কে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) যুক্তরাষ্ট্র থেকে লাটভিয়া হয়ে মস্কোয় যাওয়া মার্কিন সামরিক বিমানটি রাশিয়া ছেড়ে আবার লাটভিয়ায় ফিরে যায়।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে মস্কোর রাস্তায় একটি কূটনৈতিক বহর চলাচল করতে দেখা গেছে। তবে ওই বহরে র্যাটক্লিফ ছিলেন কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
ইউক্রেনকে হামলা স্থগিতের অনুরোধ?
সিবিএসকে এক জ্যেষ্ঠ ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা জানিয়েছেন, র্যাটক্লিফের সফরের আগে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে তাদের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের মস্কো সফরের কথা জানিয়েছিল।
ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, মার্কিন প্রতিনিধিদল রাশিয়ায় অবস্থান করা পর্যন্ত ইউক্রেনকে হামলা স্থগিত রাখার অনুরোধও করা হয়েছিল।
তবে এই দাবির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কেন হঠাৎ মস্কোয় র্যাটক্লিফ?
সাবেক ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তা জন ফোরম্যানের মতে, র্যাটক্লিফের আকস্মিক সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করা।
জার্মানিতে সাম্প্রতিক ড্রোন তৎপরতার সঙ্গে রাশিয়ার সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা নিয়ে যে আলোচনা চলছে, সেই প্রেক্ষাপটেও সফরটির গুরুত্ব থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
ফোরম্যানের ভাষ্য, কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা না ঘটলে যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত এত অল্প সময়ের নোটিশে গোপনে এত উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাকে মস্কোয় পাঠায় না।
তার মতে, রাশিয়ায় আটক মার্কিন নাগরিকদের মুক্তির বিষয়টিও আলোচনার অন্যতম কারণ হতে পারে।
বন্দিবিনিময় নিয়েও হতে পারে আলোচনা
রাশিয়ায় আটক রুশ-মার্কিন নাগরিক ক্সেনিয়া কারেলিনার মুক্তির আলোচনায় এর আগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন র্যাটক্লিফ। ইউক্রেনকে সহায়তার অভিযোগে তাকে রাশিয়ায় কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে বন্দিবিনিময় চুক্তিতেও সিআইএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ওই চুক্তির আওতায় দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাংবাদিক ইভান গেরশকোভিচ, সাবেক মার্কিন মেরিন পল হুইলান এবং রুশ-মার্কিন সাংবাদিক আলসু কুরমাশেভাসহ বেশ কয়েকজন মুক্তি পান।
ফলে এবারের সফরেও আটক মার্কিন নাগরিকদের বিষয়ে কোনো আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই ওয়াশিংটন-মস্কো সম্পর্ক তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ। পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়াও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর র্যাটক্লিফের মস্কো সফরকে ওয়াশিংটনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরাসরি যোগাযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে আলাস্কায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন ট্রাম্প। তবে ওই বৈঠক থেকে বড় কোনো অগ্রগতি আসেনি। পরে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আলোচনা শুরু হলেও তা বর্তমানে অনেকটাই স্থবির হয়ে আছে।
এই পরিস্থিতিতে সিআইএ প্রধানের গোপন মস্কো সফর নতুন কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগ, উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টা কিংবা বন্দিবিনিময়-সংক্রান্ত আলোচনার ইঙ্গিত কি না—তা নিয়েই এখন আন্তর্জাতিক মহলে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদকের নাম 




















