দেশের ঐতিহ্যবাহী পাট খাতে আবারও গতি ফেরাতে পাঁচ বছর মেয়াদি বড় পরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে সরকার। ২০৩১ সালের মধ্যে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আয় দ্বিগুণ করার পাশাপাশি পাটবীজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং উচ্চমূল্যের পাটপণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীন পাট অধিদপ্তরের তৈরি করা ‘বাংলাদেশ পাট খাত উন্নয়ন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (২০২৬-৩১)’-এর খসড়ায় এসব লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ প্রায় ৪ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রপ্তানি আয় ৮২ কোটি থেকে ১৬৪ কোটি ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য
খসড়া কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমানে বছরে প্রায় ৮২ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়। ২০৩১ সালের মধ্যে এই আয় বাড়িয়ে ১৬৪ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া কাঁচা পাটের উৎপাদন ১১৫ থেকে ১২০ লাখ বেলে উন্নীত করা, দেশের উৎপাদিত পাটবীজ দিয়ে ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ চাহিদা পূরণ এবং মূল্য সংযোজিত পাটপণ্যের অংশ ৪৫ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে দেশে আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার স্থাপন এবং পাট খাতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কমেছে রপ্তানি, বেড়েছে চ্যালেঞ্জ
গত কয়েক বছরে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। খসড়া পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে পাট খাতের রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ১১৬ কোটি ডলার। তবে চার বছর পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮২ কোটি ডলারে।
রপ্তানি কমার পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—উচ্চমূল্যের পাটপণ্যের ঘাটতি, সীমিত বাজার, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, ভারতের আরোপিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক এবং উৎপাদন সক্ষমতার সংকট।
এ ছাড়া দেশের ২৬৬টি পাটকলের মধ্যে ৭৩টি বন্ধ থাকা, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগারের অভাব এবং পাট অধিদপ্তরের জনবল সংকটকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
নতুন বাজার ও উচ্চমূল্যের পণ্যে জোর
বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের ১৫২টি দেশে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে। তবে মোট রপ্তানির প্রায় ৬৩ শতাংশই তুরস্ক, চীন ও ভারতের বাজারনির্ভর।
এই নির্ভরতা কমাতে নতুন বাজার খোঁজা এবং কাঁচা পাটের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ও উচ্চমূল্যের পাটপণ্য রপ্তানির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
পাট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ মো. নূরুল বাসির বলেন, পাট খাত নিয়ে সরকার আশাবাদী। পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনার খসড়া তৈরি হয়েছে। অংশীজনদের মতামত নেওয়ার পর তা বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সতর্ক থাকার পরামর্শ
বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) সভাপতি তাপস প্রামাণিক বলেন, রপ্তানি আয়ের সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে পাটকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সরকারের নতুন কর্মপরিকল্পনা ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও তা যেন অতীতের মতো শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে বিষয়েও নজর দিতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিকল্পনাটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের পুরোনো গৌরবের পাট খাত আবারও রপ্তানি আয়ের অন্যতম বড় উৎস হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদকের নাম 




















