প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কেএএম মাজেদুর রহমানকে ঘিরে গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে তিনি মালদ্বীপ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল, তার পরিবারের সদস্য ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের সঙ্গে মাজেদুর রহমানের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও হয়েছে।
বিদেশযাত্রায় আদালতের নিষেধাজ্ঞা
২০২৫ সালের নভেম্বরে মাজেদুর রহমানসহ ২০ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত। এরপর বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি চাইলেও আদালত তাকে অনুমতি দেননি।
দুদকের আশঙ্কা, তাকে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে চলমান অনুসন্ধান ও পরবর্তী তদন্ত বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে সংস্থাটি।
কী অভিযোগ রয়েছে মাজেদুরের বিরুদ্ধে?
দুদক সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রিমিয়ার ব্যাংকের এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে মাজেদুর রহমানের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
ব্যাংকের নির্বাহী পর্ষদের সদস্য সচিব হিসেবে বিভিন্ন চেক, বিল ও ভাউচার অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা ছিল বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত দায় নির্ধারণ হয়নি এবং অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।
দুটি কার্যাদেশে ৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকার অভিযোগ
দুদকের অনুসন্ধানে প্রিমিয়ার ব্যাংকের দুটি কার্যাদেশে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগের কথাও উঠে এসেছে।
২০১৩ সালের ১০ এপ্রিল নির্বাহী পর্ষদের একটি সভায় ‘কালার ওয়েব’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ৮৫ হাজার বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরির জন্য ৬ কোটি ২২ লাখ ২০ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ওই সভায় তৎকালীন এমডি মাজেদুর রহমান সদস্য সচিব ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, পরবর্তীতে ৮৫ হাজারের পরিবর্তে মাত্র ২৫ হাজার বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি করা হয় এবং ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানকে ৬৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এতে প্রায় ৫ কোটি ৫৭ লাখ ২০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
এর আগে ২০১২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর একই ভেন্ডরকে ২ লাখ ৬৫ হাজার ক্যালেন্ডার তৈরির জন্য ৩ কোটি ৭৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। তবে সরবরাহ করা হয় ৯০ হাজার ক্যালেন্ডার। এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটিকে ৬২ লাখ ৬০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। বাকি ৩ কোটি ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।
দুই কার্যাদেশ মিলিয়ে প্রায় ৮ কোটি ৬৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকা আত্মসাতের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দুদকের অনুসন্ধানের বরাতে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
বিএফআইইউর প্রতিবেদনেও নাম
২০২৫ সালের ১৬ জুলাই বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল, তার পরিবার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, তছরুপ, ঋণ জালিয়াতি ও অন্যান্য অনিয়ম নিয়ে একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন দেয়।
প্রতিবেদনে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তালিকায় কেএএম মাজেদুর রহমানের নামও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২৮ হাজার কোটি টাকার অভিযোগের পরিধি
দুদকের নথির বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
এর মধ্যে প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত ‘ইকবাল সেন্টার’ ভবনের অফিস ভাড়া বাবদ প্রায় ১ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে পাচার এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ বিতরণ দেখিয়ে ৪ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তির নামে এফডিআর খুলে অতিরিক্ত মুনাফা দেওয়া, প্রিমিয়ার ব্যাংক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং বিপিএল ও টেলিভিশনে ভুয়া প্রচারের নামে অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগও অনুসন্ধানে এসেছে বলে জানানো হয়েছে।
দুদকের অভিযান
সম্প্রতি রাজধানীর বনানীতে এইচবিএম ইকবালের মালিকানাধীন ‘ইকবাল সেন্টারে’ অভিযান চালায় দুদক। তল্লাশি শেষে ভবনটির বিভিন্ন অংশ, including তার চেম্বার, সিলগালা করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নগদ অর্থ বা মূল্যবান সামগ্রী না পাওয়া গেলেও বিপুলসংখ্যক নথি ও রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব নথি চলমান অনুসন্ধান ও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার মাজেদুরের
তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কেএএম মাজেদুর রহমান।
যুগান্তরকে তিনি বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যের মাধ্যমেই তিনি বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পেরেছেন।
ক্যালেন্ডার ও টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের অভিযোগের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই বলেও দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, কোনো ভেন্ডর আলাদাভাবে অনিয়ম করে থাকলে সেটি তার বিষয়।
এ ছাড়া তাকে ব্যাংকের বোর্ডের ‘সদস্য সচিব’ বলা হয়েছে—এ দাবিও ভুল বলে মন্তব্য করেন মাজেদুর রহমান। তার দাবি, ব্যাংকে ‘সদস্য সচিব’ নামে কোনো পদ নেই এবং কোম্পানি সেক্রেটারির দায়িত্ব মূলত রেকর্ড সংরক্ষণ করা।
দুদকের তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের প্রমাণ থাকলে তা প্রকাশ করা উচিত। তার দাবি, দুদকের যে প্রতিবেদনের কথা বলা হচ্ছে, সেটি মূলত তৃতীয় পক্ষের অডিট রিপোর্ট; দুদক এখনো তার বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত করেনি।
প্রতিবেদকের নাম 



















