বাংলাদেশে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ধস ও বন্যা যেন প্রতিবছরের পুনরাবৃত্ত এক বাস্তবতা। বর্ষা এলেই প্রাণহানি, ঘরবাড়ি ধ্বংস, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং মানবিক সংকটের খবর শিরোনাম হয়। এরপর সরকারি তৎপরতা, ত্রাণ বিতরণ ও সহানুভূতির প্রকাশ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রশ্নটি অনেক সময়ই আড়ালে থেকে যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলামের মতে, এ পরিস্থিতি শুধু প্রাকৃতিক কারণের ফল নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে অপরিকল্পিত পাহাড় কাটা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি স্থাপন এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনা।
তিনি বলেন, ভূ-তাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশের পাহাড়গুলো অনেক পুরোনো। বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি পাহাড়ের মাটির স্তরে প্রবেশ করে মাটির দৃঢ়তা কমিয়ে দেয়। ফলে পাহাড় সহজেই ধসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। এর সঙ্গে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে মাটি কেটে নেওয়া হলে ভাঙনের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
তার মতে, পাহাড়ের পাদদেশ সংরক্ষণ, প্রয়োজনীয় স্থানে গাইড ওয়াল বা কংক্রিট প্রতিরোধক নির্মাণ এবং পাহাড় কাটা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিলে ভূমিধসের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রশাসনের সদিচ্ছা, কার্যকর তদারকি এবং জনসচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জীবনহানি কমাতে পাহাড়ের ঢাল, চূড়া ও পাদদেশে বসতি স্থাপনের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোকে সরকারি উদ্যোগে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে পাহাড়ি এলাকায় বসতি বা কৃষিকাজের অনুমতি দেওয়া হয়। এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা অপসারণ জরুরি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু আবাসন নয়, অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় গড়ে উঠেছে, যা শিশুদের জীবনকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
এবারের দুর্যোগে পাহাড়ধসের পাশাপাশি উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা পরিস্থিতিও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এতে নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে, নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে এবং মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলামের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণই হতে পারে এই পুনরাবৃত্ত দুর্যোগের কার্যকর সমাধান।
প্রতিবেদকের নাম 



















