ভারতের উত্তর প্রদেশের গৌতম বুদ্ধ নগরের জেলা শাসক (ডিএম) মেধা রূপমকে ৭ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন এলাহাবাদ হাইকোর্ট। জাতীয় নিরাপত্তা আইন (এনএসএ) প্রয়োগ করে এক তরুণীকে পাঁচ মাস আটক রাখার ঘটনায় আদালত এই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ক্ষতিপূরণের অর্থ রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে নয়, মেধা রূপমসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বেতন থেকে কেটে নেওয়া হবে। একই সঙ্গে আদালতের রায় ও পর্যবেক্ষণ মেধা রূপমের সার্ভিস রেকর্ডে লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনায় পাঁচ মাস আটক
ঘটনাটি কয়েক মাস আগের। নয়ডার একটি শিল্প এলাকায় শ্রমিকরা বেতন বৃদ্ধি ও অন্যান্য দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। একপর্যায়ে সেই আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠে।
পুলিশের অভিযোগ ছিল, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী আকৃতি চৌধুরী ওই আন্দোলনে উসকানি দিয়েছেন। এ অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় তাঁকে পাঁচ মাস বিনা বিচারে আটক রাখা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে মোট ১১টি মামলা দেওয়া হয়েছিল।
তবে গত ২ আগস্ট এলাহাবাদ হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ আকৃতির বিরুদ্ধে এনএসএর মামলা খারিজ করে দেন। বিচারপতি অতুল শ্রীধরন ও অচল সচদেবের বেঞ্চ পর্যবেক্ষণে বলেন, তাঁকে অন্যায়ভাবে আটক করা হয়েছিল এবং পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, শ্রমিক অসন্তোষ শুরু হওয়ার আগেই আকৃতিকে আটক করা হয়েছিল।
ডিএমের ভূমিকা নিয়ে আদালতের কড়া মন্তব্য
রায়ে মেধা রূপমের ভূমিকা নিয়েও কঠোর মন্তব্য করেন বিচারপতিরা। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, তিনি সংবিধানের চেয়ে রাজনৈতিক প্রশাসনের প্রতি বেশি অনুগত থাকার চেষ্টা করেছেন। এ কারণেই আকৃতির বিরুদ্ধে এনএসএ প্রয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল বলে আদালত মনে করেন।
বিচারপতিরা বলেন, পুলিশ ও আমলাদের মনে রাখতে হবে, তাঁদের দায়বদ্ধতা সংবিধানের প্রতি। ব্রিটিশ আমলের মতো দমন-পীড়নের যন্ত্র হিসেবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করা উচিত নয়।
জর্জ অরওয়েলের ১৯৮৪ উপন্যাসের প্রসঙ্গ টেনে আদালত সতর্ক করেন, এ ধরনের প্রবণতা চলতে থাকলে উত্তর প্রদেশ একসময় অরওয়েলীয় নিয়ন্ত্রিত সমাজে পরিণত হতে পারে, যেখানে রাষ্ট্র মানুষের জীবনের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবে।
বেতন থেকেই কাটা হবে ক্ষতিপূরণ
এনএসএর মামলা খারিজের পাশাপাশি আকৃতি চৌধুরীকে ৭ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এই অর্থ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বেতন থেকে কেটে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
রাষ্ট্রের তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। একই সঙ্গে আদালতের সম্পূর্ণ রায় ও পর্যবেক্ষণ মেধা রূপমের চাকরির নথিতে সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালতের এমন সিদ্ধান্তকে সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি কঠোর বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কে এই মেধা রূপম?
মেধা রূপম ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের মেয়ে। ২০২৫ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে গৌতম বুদ্ধ নগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলার জেলা শাসকের দায়িত্ব পান তিনি। তখন তাঁর নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও বাবার প্রভাবের গুঞ্জনও উঠেছিল।
মেধা রূপম দিল্লির সেন্ট স্টিফেনস কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী। তিনি জাতীয় পর্যায়ের সাবেক শুটারও। গৌতম বুদ্ধ নগরের প্রথম নারী জেলা শাসক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
বাবাকে ঘিরেও রাজনৈতিক বিতর্ক
এদিকে মেধা রূপমের বাবা জ্ঞানেশ কুমারও বর্তমানে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন। ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য নির্বাচন কমিশনের নেওয়া বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে বিরোধীদের সঙ্গে কমিশনের বিরোধ চলছে।
বিরোধীদের অভিযোগ, এসআইআরের মাধ্যমে বেছে বেছে বিরোধী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া আলাদা বিষয়।
জ্ঞানেশ কুমার নির্বাচন কমিশনার হিসেবে যে ধরনের আইনি সুরক্ষা পান, মেধা রূপম জেলা শাসক হিসেবে আদালতের বিচারিক পর্যালোচনা থেকে সেই সুরক্ষা পাননি। এলাহাবাদ হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রায়ের ফলে তাঁর কর্মজীবনের নথিতে আদালতের এই পর্যবেক্ষণও যুক্ত হলো।
প্রতিবেদকের নাম 




















