
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে দীর্ঘদিনের চিকিৎসক সংকটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে রোগী ও স্বজনদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। জটিল রোগীদের অনেককেই উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা ও জনবল ঘাটতিও বাড়িয়েছে রোগীদের দুর্ভোগ।
শাহাবাজপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মাহতাব উদ্দিন নাতনিকে নিয়ে শিশু বিশেষজ্ঞের খোঁজে হাসপাতালের একতলা থেকে আরেকতলায় ঘুরেও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসকের দেখা পাননি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর হতাশ হয়ে তিনি বলেন, “শিশু ডাক্তারকে খুঁজছি, কিন্তু কোথায় পাব বুঝতে পারছি না।”
মাহতাব উদ্দিনের মতো প্রতিদিনই অসংখ্য রোগী ও স্বজনকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি সংকট রয়েছে মেডিসিন, সার্জারি ও শিশু বিভাগে। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে অনেক রোগীকেই অন্য হাসপাতালে যেতে হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চিকিৎসকদের অনুমোদিত ৮৫টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৩৮ জন। শূন্য রয়েছে ৪৭টি পদ। সিনিয়র কনসালট্যান্টের ১০টি পদের মধ্যে দায়িত্বে আছেন মাত্র দুজন। জুনিয়র কনসালট্যান্টের ১৪টি পদের মধ্যে কর্মরত সাতজন। এছাড়া আটটি ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসারের পদের মধ্যে রয়েছেন মাত্র দুজন এবং ২৮ জন সহকারী সার্জনের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১০ জন। প্যাথলজিস্ট, রেডিওলজিস্ট ও সহকারী রেজিস্ট্রারের একাধিক পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, গত এক মাসে সাতজন চিকিৎসক বদলি হলেও নতুন যোগ দিয়েছেন মাত্র একজন। এতে সার্জারি ও মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাসেবা আরও ব্যাহত হচ্ছে।
চর অনুপনগরের বাসিন্দা আজিজুর রহমান জানান, অসুস্থ মাকে হাসপাতালে ভর্তি করার একদিন পরই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “এখানে ভর্তি করে লাভ কী, যদি চিকিৎসাই না পাওয়া যায়?”
অন্যদিকে বহির্বিভাগেও প্রতিদিন চিকিৎসকদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে। হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে প্রায় ২০০ রোগী দেখতে হয়। দুপুর ১টার দিকেও তার কক্ষের সামনে আরও ৩০ থেকে ৪০ জন রোগী অপেক্ষা করছিলেন।
চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা নিয়েও অভিযোগ করেছেন রোগী ও স্বজনরা। সদর উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের আসিয়া খাতুন বলেন, স্বামীর চিকিৎসার জন্য তিন দিন ধরে হাসপাতালে অবস্থান করছেন। কিন্তু হাসপাতালের টয়লেট ও আশপাশের পরিবেশের দুর্গন্ধে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। তার অভিযোগ, “গত তিন দিন ধরে টয়লেট পরিষ্কার করতে কাউকে আসতে দেখিনি।”
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মাহবুব হাসান বলেন, ২৫০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ রোগী ভর্তি থাকেন। এছাড়া বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। সীমিত জনবল দিয়ে এত বিপুলসংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, “২৫০ শয্যার বিপরীতে প্রয়োজনীয় জনবল এখনো পাইনি। কয়েকজন চিকিৎসক পদোন্নতির কারণে বদলি হয়েছেন। বিশেষ করে সার্জারি ও মেডিসিন বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় সেবায় প্রভাব পড়ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”
পরিচ্ছন্নতা কর্মীর সংকটের কথাও তুলে ধরে তিনি জানান, সরকারি রাজস্ব খাতে মাত্র তিনজন এবং মাস্টাররোলে আটজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী রয়েছেন। অথচ হাসপাতালটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য অন্তত ৩০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী প্রয়োজন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জমির মো. হাসিবুস সাত্তার বলেন, বর্তমানে সার্জারি, মেডিসিন ও শিশু বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তীব্র সংকট রয়েছে। রোগীর চাপের তুলনায় চিকিৎসক কম থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি জানান, শূন্য পদে দ্রুত চিকিৎসক নিয়োগের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে। নতুন চিকিৎসক যোগ দিলে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান উন্নত হবে বলে আশা করছেন তিনি।
প্রতিবেদকের নাম 




















