ঢাকা ০৫:০০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন:
📰 Dainikbishawsongbad.com— দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ খবর, ব্রেকিং নিউজ, রাজনীতি, খেলাধুলা, বিনোদন, আন্তর্জাতিক সংবাদ ও গুরুত্বপূর্ণ সকল আপডেট পেতে প্রতিদিন ভিজিট করুন 🌍 নির্ভরযোগ্য ও দ্রুত সংবাদ পরিবেশনে আমরা সবসময় আপনার পাশে। 📢 আপনার ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের প্রচারের জন্য ব্যানার বিজ্ঞাপন ও স্পন্সর পোস্ট সুবিধা রয়েছে। 🌐 DainikBishwaSongbad.com

জিয়াউর রহমানের পথ ধরে রাষ্ট্র পুনর্গঠনে তারেক রহমান?

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর একটি দেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে পরিচালনা করা। সরকার বদলালেও প্রশাসন, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা ও জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয়। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের নিয়েই নতুন বাংলাদেশ গঠনের কাজ কতটা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব?

৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। লেখকের মতে, জুলাই বিপ্লবের পর গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়া তারেক রহমানের সামনে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের যে চ্যালেঞ্জ এসেছে, তার সঙ্গে ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতার কিছু সাদৃশ্য রয়েছে।

১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিভিন্ন দল, সংগঠন, সার্ভিস ও বাহিনীকে একটি জাতীয় দলের কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়। জেলা প্রশাসনকেও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বসম্পন্ন নতুন কাঠামোয় সাজানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও দলীয় সংগঠনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়।

পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান সেই প্রশাসনিক জনবল দিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। লেখকের মূল্যায়নে, প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে তিনি আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গঠনের ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। অর্থনীতিকে উৎপাদনমুখী করা, প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করা এবং দেশের মানুষকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশও প্রায় একই ধরনের প্রশাসনিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে বলে মনে করেন লেখক। তাঁর বক্তব্য, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় ক্ষমতা রক্ষার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির অনুসন্ধানে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত সহিংস গোষ্ঠীর পদ্ধতিগত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে সম্পৃক্ততার যুক্তিসংগত প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  কপ৩১-এ বাংলাদেশের বড় পাঁচ দাবি

তবে লেখকের মতে, কোনো কর্মকর্তা পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে চাকরি করেছেন—এটুকু দিয়ে তাঁকে দমনমূলক কর্মকাণ্ডের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। নিয়মিত দায়িত্ব পালন, বেআইনি নির্দেশ দেওয়া বা বাস্তবায়ন করা এবং রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও দায়িত্বের সীমা রক্ষার চেষ্টা—এসব বিষয় আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণে সবার জন্য একই মানদণ্ড প্রয়োগ করলে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করা কঠিন হতে পারে।

নিয়োগের পরিসংখ্যান তুলে ধরে লেখক বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের সময়ে প্রশাসনে নিয়োগের জন্য মাত্র দুটি বিসিএস সম্পন্ন হয়েছিল। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অন্তত ১৯টি বিসিএসের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর দাবি, বর্তমান প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে উপসচিব পর্যায়ের অনেকেই ওই সময়ে নিয়োগ পেয়েছেন। সচিবদের বড় একটি অংশের চাকরিজীবন শুরু হয়েছিল ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে।

লেখকের বক্তব্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রভাব ছিল। তাঁর দাবি, বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা ও পরবর্তী যাচাইয়ের ক্ষেত্রে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সুপারিশপত্র অঘোষিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। তবে ওই সময়ে নিয়োগ পাওয়া প্রত্যেক কর্মকর্তা আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

এ প্রসঙ্গে ঢাকার জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের উদাহরণ তুলে ধরেছেন লেখক। তাঁর দাবি, ফরিদা খানম বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে ছাত্রদলের নেত্রী ছিলেন; কিন্তু প্রশাসনে টিকে থাকতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তাঁকে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর প্রশংসা করতে হয়েছে।

রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রভাব নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগের ২৩ জুলাই ২০২৫ সালের বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনের ৩.৮৩ অনুচ্ছেদও উল্লেখ করেছেন লেখক। সেখানে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারি চাকরি, ব্যবসা ও উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন সুযোগের ওপর একচেটিয়া প্রভাব প্রতিষ্ঠা করেছিল। ফলে এসব ক্ষেত্রে সফল হতে কেউ কেউ দল বা এর অঙ্গসংগঠনে যোগ দেওয়ার চাপ অনুভব করতেন।

আরও পড়ুনঃ  কপ৩১-এ বাংলাদেশের বড় পাঁচ দাবি

এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কীভাবে বিদ্যমান প্রশাসনকে কাজে লাগাতে চান, সে প্রশ্ন তুলেছেন লেখক। তাঁর মতে, জিয়াউর রহমানের পথ অনুসরণের চেষ্টা করছেন তারেক রহমান। মন্ত্রিসভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্বের সুযোগ রাখা এবং প্রশাসনে অন্তর্ভুক্তিমূলক অবস্থান নেওয়ার মধ্য দিয়ে সেই প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে সততা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রত্যাশাও রয়েছে।

প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তারেক রহমানের বক্তব্যেও এ অবস্থানের প্রতিফলন রয়েছে বলে লেখকের দাবি। ২৫ এপ্রিল ২০২৬ বিআইএএমের একটি অনুষ্ঠানে তিনি কর্মকর্তাদের মেধা ও দক্ষতার মাধ্যমে সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নৈতিকতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তাঁদের জনগণের সেবক ও বন্ধু হিসেবে কাজ করতে বলেন।

লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, সততার সঙ্গে আইনসংগত দায়িত্ব পালন করলে কর্মকর্তারা সুরক্ষা পাবেন, অন্যদিকে ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তাঁদের জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে—এমন বার্তাও দেওয়া হয়েছে। এতে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে উদ্যোগী হওয়ার পাশাপাশি দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে।

বর্তমান প্রশাসনিক বাস্তবতায় মাঠপর্যায়ের কার্যালয় থেকে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা বাদ দিয়ে রাষ্ট্রের দৈনন্দিন কার্যক্রম চালানো কঠিন। ভূমিসেবা, আইনশৃঙ্খলা, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন প্রকল্প ও অন্যান্য জনসেবা সচল রাখতে প্রশাসনিক দক্ষতা প্রয়োজন। তাই একজন আমলা, পুলিশ কর্মকর্তা কিংবা বিচারক যেন নিজ নিজ দায়িত্ব পেশাদারত্ব ও স্বাধীন বিবেচনায় পালন করতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন লেখক।

তবে প্রশাসনের মধ্যে কেউ এখনো গোপনে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো স্বার্থে কাজ করছেন কি না, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন তিনি। তাঁর মতে, পুরো প্রশাসনকে সন্দেহের চোখে দেখলে রাষ্ট্র পরিচালনা কঠিন হবে; আবার কোনো কর্মকর্তা অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহারে জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশন আয়োজিত বিপ্লব ও সংহতি দিবসের এক আলোচনায় অংশ নিয়ে লেখক ৭ নভেম্বরের শিক্ষা ও বর্তমান সরকারের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, প্রশাসনের কর্মকর্তারা যেন অতীতের রাজনৈতিক পরিচয়ের তকমা নিয়ে দ্বিধায় না থেকে জিয়াউর রহমানের আমলের মতো দেশ গঠনে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেন।

আরও পড়ুনঃ  কপ৩১-এ বাংলাদেশের বড় পাঁচ দাবি

ওই আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি বাণী উদ্ধৃত করে বলা হয়, “ভবিষ্যতে আর কেউ যাতে দেশ এবং জনগণের অধিকার হরণ করতে না পারে, দেশকে তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে, এটিই হোক আমাদের এবারের ৭ নভেম্বরের প্রধান অঙ্গীকার। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য।”

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনার মুহাম্মদ আবদুল মুহিতও সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে সহকর্মীদের একই আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাবার মতো সবাইকে দেশ গঠনে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছেন।’ এই সুযোগ গ্রহণ করে নতুন বাংলাদেশ গঠনে প্রধানমন্ত্রীর সহযাত্রী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

লেখকের মতে, জিয়াউর রহমান ও তারেক রহমানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ক্ষমতায় আসার প্রক্রিয়া ভিন্ন হলেও উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া প্রশাসনিক কাঠামোকে রাষ্ট্রের কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে তাঁদের অভিজ্ঞতার মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে।

তিনি মনে করেন, বাকশালের সময়কার প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে জিয়াউর রহমান যেমন আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তেমনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গড়ে ওঠা প্রশাসনিক কাঠামোকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন তারেক রহমান। এ বাস্তবতা দেশের জনগণ, প্রশাসন এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের উপলব্ধি করা প্রয়োজন।

লেখকের মূল্যায়নে, বিদ্যমান জনবলের সক্ষমতা কাজে লাগানোর পাশাপাশি সততা, পেশাদারত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলেই একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। তবে সরকারি কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানে কতটা সাড়া দেবেন এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় তারেক রহমান কতটা সফল হবেন, তা সময়ই বলে দেবে।

লেখক: ব্যারিস্টার মাহাবুবুর রহমান, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও রয়টার্সের সাবেক সাংবাদিক।

T ag

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় পোস্ট

জিয়াউর রহমানের পথ ধরে রাষ্ট্র পুনর্গঠনে তারেক রহমান?

আপডেটের সময়: ০২:৩০:১৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর একটি দেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে পরিচালনা করা। সরকার বদলালেও প্রশাসন, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা ও জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয়। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের নিয়েই নতুন বাংলাদেশ গঠনের কাজ কতটা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব?

৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। লেখকের মতে, জুলাই বিপ্লবের পর গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়া তারেক রহমানের সামনে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের যে চ্যালেঞ্জ এসেছে, তার সঙ্গে ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতার কিছু সাদৃশ্য রয়েছে।

১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিভিন্ন দল, সংগঠন, সার্ভিস ও বাহিনীকে একটি জাতীয় দলের কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়। জেলা প্রশাসনকেও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বসম্পন্ন নতুন কাঠামোয় সাজানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও দলীয় সংগঠনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়।

পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান সেই প্রশাসনিক জনবল দিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। লেখকের মূল্যায়নে, প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে তিনি আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গঠনের ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। অর্থনীতিকে উৎপাদনমুখী করা, প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করা এবং দেশের মানুষকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশও প্রায় একই ধরনের প্রশাসনিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে বলে মনে করেন লেখক। তাঁর বক্তব্য, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় ক্ষমতা রক্ষার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির অনুসন্ধানে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত সহিংস গোষ্ঠীর পদ্ধতিগত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে সম্পৃক্ততার যুক্তিসংগত প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  কপ৩১-এ বাংলাদেশের বড় পাঁচ দাবি

তবে লেখকের মতে, কোনো কর্মকর্তা পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে চাকরি করেছেন—এটুকু দিয়ে তাঁকে দমনমূলক কর্মকাণ্ডের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। নিয়মিত দায়িত্ব পালন, বেআইনি নির্দেশ দেওয়া বা বাস্তবায়ন করা এবং রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও দায়িত্বের সীমা রক্ষার চেষ্টা—এসব বিষয় আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণে সবার জন্য একই মানদণ্ড প্রয়োগ করলে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করা কঠিন হতে পারে।

নিয়োগের পরিসংখ্যান তুলে ধরে লেখক বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের সময়ে প্রশাসনে নিয়োগের জন্য মাত্র দুটি বিসিএস সম্পন্ন হয়েছিল। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অন্তত ১৯টি বিসিএসের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর দাবি, বর্তমান প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে উপসচিব পর্যায়ের অনেকেই ওই সময়ে নিয়োগ পেয়েছেন। সচিবদের বড় একটি অংশের চাকরিজীবন শুরু হয়েছিল ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে।

লেখকের বক্তব্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রভাব ছিল। তাঁর দাবি, বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা ও পরবর্তী যাচাইয়ের ক্ষেত্রে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সুপারিশপত্র অঘোষিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। তবে ওই সময়ে নিয়োগ পাওয়া প্রত্যেক কর্মকর্তা আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

এ প্রসঙ্গে ঢাকার জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের উদাহরণ তুলে ধরেছেন লেখক। তাঁর দাবি, ফরিদা খানম বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে ছাত্রদলের নেত্রী ছিলেন; কিন্তু প্রশাসনে টিকে থাকতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তাঁকে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর প্রশংসা করতে হয়েছে।

রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রভাব নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগের ২৩ জুলাই ২০২৫ সালের বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনের ৩.৮৩ অনুচ্ছেদও উল্লেখ করেছেন লেখক। সেখানে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারি চাকরি, ব্যবসা ও উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন সুযোগের ওপর একচেটিয়া প্রভাব প্রতিষ্ঠা করেছিল। ফলে এসব ক্ষেত্রে সফল হতে কেউ কেউ দল বা এর অঙ্গসংগঠনে যোগ দেওয়ার চাপ অনুভব করতেন।

আরও পড়ুনঃ  কপ৩১-এ বাংলাদেশের বড় পাঁচ দাবি

এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কীভাবে বিদ্যমান প্রশাসনকে কাজে লাগাতে চান, সে প্রশ্ন তুলেছেন লেখক। তাঁর মতে, জিয়াউর রহমানের পথ অনুসরণের চেষ্টা করছেন তারেক রহমান। মন্ত্রিসভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্বের সুযোগ রাখা এবং প্রশাসনে অন্তর্ভুক্তিমূলক অবস্থান নেওয়ার মধ্য দিয়ে সেই প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে সততা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রত্যাশাও রয়েছে।

প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তারেক রহমানের বক্তব্যেও এ অবস্থানের প্রতিফলন রয়েছে বলে লেখকের দাবি। ২৫ এপ্রিল ২০২৬ বিআইএএমের একটি অনুষ্ঠানে তিনি কর্মকর্তাদের মেধা ও দক্ষতার মাধ্যমে সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নৈতিকতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তাঁদের জনগণের সেবক ও বন্ধু হিসেবে কাজ করতে বলেন।

লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, সততার সঙ্গে আইনসংগত দায়িত্ব পালন করলে কর্মকর্তারা সুরক্ষা পাবেন, অন্যদিকে ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তাঁদের জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে—এমন বার্তাও দেওয়া হয়েছে। এতে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে উদ্যোগী হওয়ার পাশাপাশি দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে।

বর্তমান প্রশাসনিক বাস্তবতায় মাঠপর্যায়ের কার্যালয় থেকে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা বাদ দিয়ে রাষ্ট্রের দৈনন্দিন কার্যক্রম চালানো কঠিন। ভূমিসেবা, আইনশৃঙ্খলা, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন প্রকল্প ও অন্যান্য জনসেবা সচল রাখতে প্রশাসনিক দক্ষতা প্রয়োজন। তাই একজন আমলা, পুলিশ কর্মকর্তা কিংবা বিচারক যেন নিজ নিজ দায়িত্ব পেশাদারত্ব ও স্বাধীন বিবেচনায় পালন করতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন লেখক।

তবে প্রশাসনের মধ্যে কেউ এখনো গোপনে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো স্বার্থে কাজ করছেন কি না, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন তিনি। তাঁর মতে, পুরো প্রশাসনকে সন্দেহের চোখে দেখলে রাষ্ট্র পরিচালনা কঠিন হবে; আবার কোনো কর্মকর্তা অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহারে জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশন আয়োজিত বিপ্লব ও সংহতি দিবসের এক আলোচনায় অংশ নিয়ে লেখক ৭ নভেম্বরের শিক্ষা ও বর্তমান সরকারের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, প্রশাসনের কর্মকর্তারা যেন অতীতের রাজনৈতিক পরিচয়ের তকমা নিয়ে দ্বিধায় না থেকে জিয়াউর রহমানের আমলের মতো দেশ গঠনে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেন।

আরও পড়ুনঃ  কপ৩১-এ বাংলাদেশের বড় পাঁচ দাবি

ওই আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি বাণী উদ্ধৃত করে বলা হয়, “ভবিষ্যতে আর কেউ যাতে দেশ এবং জনগণের অধিকার হরণ করতে না পারে, দেশকে তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে, এটিই হোক আমাদের এবারের ৭ নভেম্বরের প্রধান অঙ্গীকার। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য।”

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনার মুহাম্মদ আবদুল মুহিতও সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে সহকর্মীদের একই আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাবার মতো সবাইকে দেশ গঠনে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছেন।’ এই সুযোগ গ্রহণ করে নতুন বাংলাদেশ গঠনে প্রধানমন্ত্রীর সহযাত্রী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

লেখকের মতে, জিয়াউর রহমান ও তারেক রহমানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ক্ষমতায় আসার প্রক্রিয়া ভিন্ন হলেও উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া প্রশাসনিক কাঠামোকে রাষ্ট্রের কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে তাঁদের অভিজ্ঞতার মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে।

তিনি মনে করেন, বাকশালের সময়কার প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে জিয়াউর রহমান যেমন আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তেমনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গড়ে ওঠা প্রশাসনিক কাঠামোকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন তারেক রহমান। এ বাস্তবতা দেশের জনগণ, প্রশাসন এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের উপলব্ধি করা প্রয়োজন।

লেখকের মূল্যায়নে, বিদ্যমান জনবলের সক্ষমতা কাজে লাগানোর পাশাপাশি সততা, পেশাদারত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলেই একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। তবে সরকারি কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানে কতটা সাড়া দেবেন এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় তারেক রহমান কতটা সফল হবেন, তা সময়ই বলে দেবে।

লেখক: ব্যারিস্টার মাহাবুবুর রহমান, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও রয়টার্সের সাবেক সাংবাদিক।