সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত এবং ভারতে দেশটির রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের এক্স পোস্টের মাধ্যমে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে একটি ‘অভূতপূর্ব চুক্তি’ হয়েছে। ওই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে ঠিক কতটি উড়োজাহাজ কেনা হবে, সে বিষয়ে পোস্টে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশের বর্তমান আর্থসামাজিক বাস্তবতায় এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ জ্বালানির বাড়তি ব্যয়, কর্মসংস্থানের সংকোচন এবং ঋণের চাপের মধ্যে নতুন করে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে উড়োজাহাজ কেনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভাবার অবকাশ রয়েছে।
১৪টি বোয়িং কেনার চুক্তি আগেই হয়েছে
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে চলতি বছরের এপ্রিলে বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮ ম্যাক্স কেনার কথা রয়েছে।
এই ১৪টি উড়োজাহাজের বাজারমূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। চুক্তি অনুযায়ী প্রথম উড়োজাহাজটি ২০৩১ সালের নভেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা। বাকি উড়োজাহাজগুলো ২০৩৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে বিমানের বহরে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে এই প্রক্রিয়ার শুরু আরও আগে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার জন্য ক্রয়াদেশ দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। যদিও তখন বিমান কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কিছু জানে না বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে ৩০ ডিসেম্বর বিমান পরিচালনা পর্ষদ ১৪টি বোয়িং কেনার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত ‘অপ্রকাশযোগ্য বাণিজ্য চুক্তি’র আওতায় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এখন আগের ১৪টির সঙ্গে আরও বোয়িং কেনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে অর্থের জোগান নিয়ে
বোয়িংয়ের মতো আধুনিক উড়োজাহাজ জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইনসের বহরে যুক্ত হওয়া নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো—এই বিপুল অর্থের সংস্থান হবে কীভাবে?
লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণ ইতোমধ্যে ১১৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে অর্থনীতিবিদদের হিসাবে উঠে এসেছে। নতুন করে বড় অঙ্কের ঋণ বা অর্থনৈতিক দায় তৈরি হলে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিকে লেখক নেত্রকোনার বারহাট্টার একটি শৈশবের গল্পের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ঘোড়ার পিঠে দুই বস্তা ধান বহন করা স্বাভাবিক হলেও তৃতীয় বস্তা চাপিয়ে বেল্ট শক্ত করে বাঁধলে ঘোড়াটি হাঁপিয়ে পড়ত। তারপরও সহিস তাকে বলত, যতই কষ্ট হোক, বারহাট্টা তাকে যেতেই হবে।
লেখকের মতে, বর্তমান সময়ে সাধারণ মানুষের অবস্থাও অনেকটা সেই ঘোড়ার মতো।
নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে চাপে মানুষ
গত কয়েক বছরে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। পেঁয়াজ, সয়াবিন, চাল, ডাল, মরিচসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি বিদ্যুৎ, গ্যাস, সার, ডিজেল ও পেট্রোলের দামও বেড়েছে। অন্যদিকে মানুষের আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না বলে লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৬ সালের জুনে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং সঞ্চালন চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বাড়ানো হয়। বিদ্যুতের দাম বাড়ার প্রভাব অন্যান্য পণ্য ও সেবার খরচেও পড়ছে।
কৃষি খাতেও সারের দাম ও সরবরাহ নিয়ে নানা সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে। অনেক এলাকায় সরকার নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না বলেও লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে।
খাদ্যনিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ
গত ২৩ জুলাই প্রকাশিত ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশনের (আইপিসি) বিশ্লেষণে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
এর মধ্যে ৭ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ চরম জরুরি অবস্থায় পড়তে পারে বলেও ওই বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
এলএনজি আমদানির ব্যয় বাড়ছে
দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় ঘাটতি পূরণে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত একটি এফএসআরইউ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২০-২১ অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ১৬ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই ব্যয় বেড়ে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
এর সঙ্গে বেড়েছে সরকারের ভর্তুকির চাপও। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এলএনজি আমদানি শুরুর সময় ভর্তুকি ছিল প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০২১-২২, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ছিল বছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে ৮ হাজার ৯০০ কোটি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় পৌঁছায়।
কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার কথাও তুলে ধরা হয়েছে
জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে বলে লেখায় দাবি করা হয়েছে। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গত দুই বছরে নানা কারণে পাঁচ শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে কয়েক লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।
ফলে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, ওষুধ, যাতায়াত ও সন্তানের লেখাপড়ার খরচ—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
‘বারহাট্টার ঘোড়ার’ উপমায় জনগণের চাপ
লেখকের মতে, এমন পরিস্থিতিতে প্রথমে ১৪টি এবং পরে আরও অনির্দিষ্টসংখ্যক বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে পারে।
অর্থনীতির সাধারণ সূত্র অনুযায়ী, বড় ধরনের সরকারি ব্যয় বা ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে জনগণের ওপরই পড়ে—এমন যুক্তি তুলে ধরে লেখক বলেছেন, প্রতিদিন নতুন নতুন বোঝা চাপতে চাপতে সাধারণ মানুষের অবস্থা যেন সেই বারহাট্টার ঘোড়ার মতো হয়ে উঠেছে।
লেখার শেষাংশে সেই উপমা টেনে বলা হয়েছে, মানুষের কষ্ট যতই বাড়ুক, অদৃশ্য সহিস যেন তাকে বলেই চলেছে—বোঝা টেনে যেতেই হবে।
লেখক: মোশতাক আহমেদ, সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলাম লেখক
প্রতিবেদকের নাম 




















