বিশ্ববাজারে এলএনজি ও জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য এবং দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত কমে আসায় বিকল্প জ্বালানি হিসেবে নিজস্ব কয়লা উত্তোলনে জোর দিচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী ও বড়পুকুরিয়াসহ বিভিন্ন কয়লাক্ষেত্র নিয়ে নতুন করে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, ফুলবাড়ীতে স্থানীয়দের সম্মতি ও সামাজিক সমস্যার সমাধান হলে কয়লা উত্তোলনের কার্যক্রম শুরু করা হতে পারে। আর বড়পুকুরিয়ায় নতুন করে ৩০০ একর এলাকায় কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জয়পুরহাটের জামালগঞ্জেও কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে।
জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, ফুলবাড়ীর কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের আয়-রোজগার, বসতি ও পরিবেশের বিষয়গুলো সুষ্ঠুভাবে সমাধান করেই এগোতে চায় সরকার। গত ২ সেপ্টেম্বর তিনি সংসদে বলেন, ফুলবাড়ীর কয়লা উন্নতমানের এবং এটি উত্তোলন করা গেলে জ্বালানি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতে পারে।
দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা প্রায় ৮ হাজার মেগাওয়াট। এসব কেন্দ্র চালাতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কয়লা আমদানি করতে হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিজস্ব কয়লা উত্তোলন বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব।
পেট্রোবাংলার এক পরিচালক জানান, ফুলবাড়ীতে কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা সামাজিক ও জমি অধিগ্রহণের বিষয়। বিশেষ করে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতা রয়েছে। স্থানীয় ও সামাজিক পরিস্থিতির উন্নতি হলে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
বড়পুকুরিয়ায় নতুন ৩০০ একর এলাকায় কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে স্থানীয়দের মোটামুটি সম্মতি পাওয়া গেছে। সেখানে বোরহোল করার প্রস্তুতি চলছে। বিদেশি একটি কোম্পানি এ কাজের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে রংপুরের খালাশপীরে কয়লা উত্তোলনের পরিকল্পনা থাকলেও এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ক্ষতি, প্রতিবন্ধকতা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন। তার মতে, দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রেখে আমদানির মাধ্যমে কয়লা সরবরাহ করার পাশাপাশি নিজস্ব উৎপাদন ও প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনা করা দরকার।
ভূতত্ত্ববিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বলেন, দেশের খনিজসম্পদ ব্যবহার করা উচিত, তবে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব এড়িয়ে তা করতে হবে। তার মতে, বাংলাদেশের ঘনবসতিপূর্ণ ও উর্বর ভূমির কারণে উন্মুক্ত পদ্ধতির পরিবর্তে ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন বেশি উপযোগী।
দেশের পাঁচটি কয়লাক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ মজুত রয়েছে। এসব ক্ষেত্রের মোট মজুতের ২০ শতাংশ উত্তোলন করা গেলে প্রায় ১ হাজার ৫৬৪ মিলিয়ন টন কয়লা পাওয়া যেতে পারে, যা প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সমপরিমাণ জ্বালানি চাহিদা পূরণ করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমানে পেট্রোবাংলা একমাত্র বড়পুকুরিয়া খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করছে। সেখানে প্রায় ৩৯০ মিলিয়ন টন কয়লা মজুত রয়েছে। প্রতিবছর সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টন কয়লা উত্তোলন করছে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি।
জয়পুরহাটের জামালগঞ্জে প্রায় ৫ হাজার ৪৫০ মিলিয়ন টন কয়লার মজুতের কথা বলা হয়েছে। নতুন সমীক্ষায় এ মজুত প্রায় ৫৫০ কোটি টনে উন্নীত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ৬৪০ থেকে ১ হাজার ১৫৮ মিটার গভীরে কয়লা থাকায় প্রচলিত পদ্ধতিতে উত্তোলনে প্রযুক্তিগত ঝুঁকি ও ব্যয় বেশি। এ কারণে সেখানে আন্ডারগ্রাউন্ড কোল গ্যাসিফিকেশন (ইউসিজি) পদ্ধতির সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া দিনাজপুরের দীঘিপাড়ায় ৮৬৫ মিলিয়ন টন, রংপুরের খালাশপীরে ৬৮৫ মিলিয়ন টন এবং ফুলবাড়ীতে ৫৭২ মিলিয়ন টন কয়লা মজুত রয়েছে। ফুলবাড়ী থেকে প্রায় ৪৭২ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বছরে সেখানে সর্বোচ্চ ১৫ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য বছরে প্রায় ২০ মিলিয়ন টন কয়লা আমদানি করা হয়।
প্রতিবেদকের নাম 




















