জ্বালানি খাতে লুটপাট বন্ধের পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে চলমান সংকট মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উদ্যোগে ‘বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অপ্রাপ্ততা এবং অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে’ আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
ক্যাবের সভাপতি এ. এইচ. এম. সফিকুজ্জামানের সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া, কোষাধ্যক্ষ শওকত আলী খান, সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, বাংলাদেশ সাধারণ নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ এবং ক্যাবের উপদেষ্টা খলিলুর রহমান প্রমুখ।
চুরি-লুটপাট বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
সভাপতির বক্তব্যে এ. এইচ. এম. সফিকুজ্জামান বলেন, জ্বালানি খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে সময় প্রয়োজন হলেও খাতে যে চুরি ও লুটপাট হচ্ছে, তা বন্ধ করতে কোনো সময়ক্ষেপণের প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, বর্তমানে লোডশেডিং হলেও বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ দাম বাড়লেও অনেক গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল ১০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষ্য, বিদ্যুৎ সরবরাহ কমার পরও যদি বিল উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে, তাহলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ক্যাব সভাপতি প্রশ্ন তোলেন, ব্যক্তি বা কোনো গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে আমদানিনির্ভরতা বাড়ানো হচ্ছে কি না। সংকট ঘনীভূত হওয়ার পর স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে সরাসরি জ্বালানি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
জ্বালানি কেনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি
সফিকুজ্জামান বলেন, সরাসরি জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঝুঁকি থাকে। তাই সংকটের প্রকৃত তথ্য জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি চুরি ও লুটপাট বন্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
তিনি বলেন, দেশের ৪০০-এর বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও তৈরি পোশাক খাত বর্তমানে সংকটের মুখে রয়েছে। অনেক অর্ডার অন্য দেশে চলে যাওয়ায় বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের বেকার হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে পরিবহন খাতে অরাজকতা তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এর প্রভাব সরাসরি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর পড়ছে। সবজি ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
গ্যাস-বিদ্যুতের সিস্টেম লস কমানোর আহ্বান
ক্যাব সভাপতি বলেন, অতীতে আমদানিনির্ভরতার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে সিস্টেম লস এবং চুরি কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
তিনি আরও বলেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। একই সঙ্গে খাতটির অনিয়ম ও অপচয় বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা নিয়েও সমালোচনা
ওষুধ নীতির পরিবর্তনের সমালোচনা করে সফিকুজ্জামান বলেন, ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ওষুধশিল্প উল্লেখযোগ্যভাবে বিকশিত হয়েছে। বর্তমানে দেশের চাহিদার বড় অংশ স্থানীয়ভাবে পূরণ হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে।
তার অভিযোগ, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা থেকে হঠাৎ করে অনেক ওষুধ বাদ দেওয়ায় সাধারণ মানুষ ও ওষুধশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বাজারে নকল ও ভেজাল খাবারের বিস্তার জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। এর ফলে ক্যান্সার, কিডনি রোগ ও হৃদরোগের মতো অসংক্রামক রোগ বাড়ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান
রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র ও বৈষম্যমুক্ত সমাজের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সরকারকে তা বিবেচনায় নিতে হবে। সরকার যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেশ পরিচালনা করছে, সেখানে জনস্বার্থ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তিনি বলেন, জনগণের স্বার্থকে সামনে রেখে আইন প্রণয়ন ও নীতি গ্রহণ করতে হবে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত নিরসনের পাশাপাশি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা পুনর্বিবেচনা করে জরুরি ভিত্তিতে নতুন তালিকা প্রণয়ন এবং ওষুধের দাম নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রতিবেদকের নাম 
























