
দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের প্রভাবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর এই চাপ বেশি পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দারিদ্র্য কমানো এবং নতুন করে মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া থেকে রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
শুক্রবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ বিষয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
এর আগে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও ব্যাংক অব আমেরিকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে।
### মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের চাপ
ড. তিতুমীর বলেন, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাবও অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে পড়তে পারে। এসব চাপ মোকাবিলায় সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং জ্বালানির দাম সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ যতটা সম্ভব সীমিত রাখার চেষ্টা করছে।
তিনি জানান, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মূল্যায়নে মূল্যস্ফীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে মানুষের দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে। তাঁর উল্লেখ করা বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, অতীতের দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে বাংলাদেশে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
### উপকারভোগী নির্বাচনে ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির দুর্বলতা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, অতীতে উপকারভোগী নির্বাচনে ত্রুটি ছিল। প্রকৃত সহায়তাপ্রত্যাশীদের অনেকে তালিকায় স্থান পাননি, আবার যাঁদের পাওয়ার কথা নয়, তাঁদেরও কেউ কেউ তালিকাভুক্ত হয়েছেন। এ সমস্যা কমাতে প্রকৃত উপকারভোগীদের শনাক্ত করে তাঁদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দিতে সরকার ডিজিটাল জনপরিকাঠামো ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
ড. তিতুমীরের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাধীন গবেষণা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে ফ্যামিলি কার্ড কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দারিদ্র্য প্রায় ৫ শতাংশ কমতে পারে। তিনি বলেন, এসব কর্মসূচি প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত হয়েছে এবং পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক কৌশলেও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
### মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আর্থিক সংস্কারের প্রয়োজন
উপদেষ্টার মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু কঠোর মুদ্রানীতি যথেষ্ট নয়; রাজস্ব ও আর্থিক খাতের সংস্কারও প্রয়োজন। সরকারের লক্ষ্য রাজস্ব আয় বাড়ানো, কর ফাঁকি ও কর জালিয়াতি কমানো এবং পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা।
তিনি জানান, গত অর্থবছরে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৩ শতাংশ। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে এ প্রবৃদ্ধি বেড়ে ১২ থেকে ১৩ শতাংশে পৌঁছেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, সংস্কারের অগ্রগতি মূল্যায়নে বাস্তব ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ।
আইএমএফের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট পূর্বাভাসের শর্ত ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি। অতীতে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে যে সংশয় তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সরকার সংস্কারের মাধ্যমে তা দূর করতে চায়।
### ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানোর উদ্যোগ
ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন ড. তিতুমীর। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অতীতের অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের কারণে প্রায় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি সামনে এসেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনার কাজ চলছে।
তিনি আরও বলেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে আমানতকারীরা প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ তুলতে পারছেন। পাশাপাশি অনেকে নতুন করে আমানত রাখছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার কমে আসাকেও তিনি আর্থিক খাতের ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ হিসেবে দেখেন।
### মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে বাড়ছে আমদানি ব্যয়
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও সারের আমদানি ব্যয় বাড়ছে বলে জানান উপদেষ্টা। তাঁর মতে, শুধু অতিরিক্ত ব্যয়ের হিসাব দিয়ে অর্থনীতিতে সংকটের পূর্ণ প্রভাব বোঝা সম্ভব নয়। কৃষকদের ওপর চাপ কমাতে ডিজেলের দাম না বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সংকট সৃষ্টিতে বাংলাদেশের ভূমিকা না থাকলেও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে সরকার এর প্রভাব মোকাবিলায় কাজ করছে।
### উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনা
অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াতে বাংলাদেশকে উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্র ও রপ্তানির প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার কৌশল নেওয়া হয়েছে বলে জানান ড. তিতুমীর।
সরকারের লক্ষ্য নিজস্ব রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমিয়ে টেকসই উন্নয়নের পথ তৈরি করা।
উল্লেখ্য, ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ও আইএমএফের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।
এবারের সভায় বৈশ্বিক অর্থনীতি, উন্নয়ন অর্থায়ন, দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং আর্থিক খাতের সংস্কার গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সংস্কার ও উন্নয়ন অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ হিসেবে এ সভাকে দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেদকের নাম 




















