রাজধানীর দীর্ঘদিনের যানজট ও বিশৃঙ্খলা কমাতে এবার প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনছে সরকার। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গুরুত্বপূর্ণ ৫০টি ট্রাফিক মোড়ে বসানো হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সমৃদ্ধ স্বয়ংক্রিয় সংকেতবাতি।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি মোড় আধুনিকায়নে গড়ে প্রায় ২ কোটি টাকা করে খরচ হবে।
৫০ মোড়ে হবে পূর্ণাঙ্গ আধুনিকায়ন
শুধু নতুন ট্রাফিক বাতি বসানো নয়, প্রতিটি মোড়কে একটি পূর্ণাঙ্গ এআই-ভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। এজন্য সিগন্যালের দুই পাশে নিরাপত্তা স্টিলের বেড়া, শক্তিশালী খুঁটি ও কংক্রিটের ভিত্তি, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং প্রয়োজনীয় সড়ক অবকাঠামো তৈরি করা হবে।
এ ছাড়া ট্রাফিক পুলিশের জন্য নিয়ন্ত্রণকক্ষ, এআই ক্যামেরা, সংকেত নিয়ন্ত্রণ বক্স, বিশেষ ট্যাব এবং প্রয়োজনীয় সফটওয়্যারও স্থাপন করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় পূর্তকাজের মধ্যে থাকবে বেড়া নির্মাণ, খুঁটির ভিত্তি তৈরি, বিদ্যুতায়ন ও সড়ক কাটিং। এসব কাজে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা রয়েছে।
১০০ কোটি টাকার বাজেট
গত ১৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আধুনিক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় দুই সিটি করপোরেশনকে ৫০ কোটি টাকা করে মোট ১০০ কোটি টাকার বিশেষ বাজেট দিয়েছে।
এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৮টি মোড়ের জন্য প্রায় ৫৫ কোটি টাকা এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২২টি মোড়ের জন্য প্রায় ৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
নকশা ও প্রযুক্তিতে থাকবে বুয়েট
এই প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। বিশ্ববিদ্যালয়টি সিগন্যাল ব্যবস্থার মূল নকশা তৈরি, আধুনিক প্রযুক্তি সরঞ্জাম সরবরাহ, এআই ক্যামেরা স্থাপন এবং যানবাহন চলাচল নিয়ে প্রয়োজনীয় জরিপ পরিচালনা করবে।
এআই ক্যামেরার মাধ্যমে যানবাহনের চলাচল পর্যবেক্ষণ করে পরিস্থিতি অনুযায়ী ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হবে।
উত্তরের যেসব এলাকায় কাজ হবে
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় মিরপুর, মোহাম্মদপুর, আগারগাঁও, গুলশান, তেজগাঁও ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, আসাদ গেট, গণভবন, মোহাম্মদপুর থানা, কলেজ গেট, টেকনিক্যাল, মাজার রোড, মিরপুর-১, মিরপুর-৬, মিরপুর-১০, মিরপুর-১২, মিরপুর-১৪ ও সনি সিনেমা হল এলাকা।
এ ছাড়া আগারগাঁও, আবহাওয়া অধিদপ্তর, পরিকল্পনা কমিশন, গুলশান-১, গুলশান ক্লাব, গুলশান আজাদ মসজিদ, ডোমিনোজ ক্রসিং, পুলিশ প্লাজা, নিকেতন, তেজগাঁও পুরোনো আড়ং, শান্তা টাওয়ার, তেজগাঁও-মহাখালী লিংক রোড, রেইনবো ক্রসিং এবং হাতিরঝিল-মগবাজার ক্রসিংও রয়েছে তালিকায়।
দক্ষিণ ঢাকার যেসব মোড়ে বসবে এআই সিগন্যাল
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় পুরান ঢাকা, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, শাহবাগ, কাকরাইল, মতিঝিল ও বাণিজ্যিক এলাকার গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোকে প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে।
তালিকায় রয়েছে আজিমপুর, নিউমার্কেট, সায়েন্স ল্যাব, ধানমন্ডি-৬, ধানমন্ডি-৭, ধানমন্ডি-২৭, কলাবাগান, রাসেল স্কয়ার, কাঁটাবন, বাটা সিগন্যাল, গ্রিন রোড, কাকরাইল, মিন্টো রোড ও অফিসার্স ক্লাব ক্রসিং।
এ ছাড়া বিজয়নগর, ফকিরেরপুল, দৈনিক বাংলা মোড়, বঙ্গভবন, গুলিস্তান স্কয়ার, জিপিও, পল্টন মোড় ও মগবাজার মোড়ও আধুনিকায়নের তালিকায় রয়েছে।
শুধু সিগন্যাল নয়, বদলাবে সড়ক ব্যবস্থাপনাও
নির্বাচিত ৫০টি মোড়ে শুধু ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিকায়নেই সীমাবদ্ধ থাকছে না উদ্যোগটি। অবৈধ পার্কিং উচ্ছেদ, পথচারীদের নিরাপদ পারাপার এবং নির্দিষ্ট বাস স্টপেজ নির্ধারণের কাজও করা হবে।
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই মোড়গুলোতে যানজট নিয়ন্ত্রণ করা গেলে পুরো ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আগেও ২২ মোড়ে বসানো হয়েছে এআই সিগন্যাল
এর আগে প্রথম ধাপে ফার্মগেট, বাংলামোটর, বিজয়নগর ও বিজয় সরণিসহ ২২টি মোড়ে দেশীয় প্রযুক্তির সংকেতবাতি ও এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছিল।
মাঠপর্যায়ের ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের দাবি, স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থার কারণে লাল বাতি জ্বললে অনেক চালক নিজে থেকেই গাড়ি থামাচ্ছেন। ফলে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ওপর আগের তুলনায় কিছুটা চাপ কমেছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় জরিমানার ব্যবস্থা চালকদের ট্রাফিক আইন মানতে উৎসাহিত করতে পারে। তবে শুধু প্রযুক্তি স্থাপন করলেই হবে না—লেন মেনে গাড়ি চালানোসহ অন্যান্য ট্রাফিক শৃঙ্খলাও কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
শিগগিরই শুরু হচ্ছে কাজ
বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যেই সেখানে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে দরপত্র প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। দুই সিটিতে দ্রুত কাজ শুরু করে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আরও স্মার্ট, স্বয়ংক্রিয় ও প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর ব্যস্ত মোড়গুলোতে যানজট কমানো, ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন এবং যান চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে।
প্রতিবেদকের নাম 




















