জম্মু ও কাশ্মীরের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগের ধরন বদলেছে সন্ত্রাসীদের। আগে মোবাইল ফোন ব্যবহারের কারণে যে ডিজিটাল চিহ্ন নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নজরে আসত, এখন তা এড়িয়ে সিমকার্ড, মোবাইল টাওয়ার কিংবা ওয়াই-ফাই ছাড়াই যোগাযোগ করছে তারা।
নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর দাবি, এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে লোরা (LoRa—Low Range) প্রযুক্তিভিত্তিক বিশেষ যোগাযোগযন্ত্র।
কীভাবে কাজ করছে এই প্রযুক্তি
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাশ্মীরে পাকিস্তানি সন্ত্রাসী কমান্ডারদের কাছ থেকে একাধিক উন্নত যোগাযোগযন্ত্র উদ্ধারের পর বিষয়টি সামনে আসে। নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এগুলো সাধারণ ওয়াকিটকি নয়; বরং এনক্রিপ্ট করা রেডিও ডিভাইস।
এসব যন্ত্রের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা যায় এবং একটি ডিভাইস অন্যটির সংকেতও পুনরায় পাঠাতে পারে। ফলে দুর্গম এলাকায় একাধিক যন্ত্র একসঙ্গে কাজ করে নিজেদের একটি যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারে।
লোরা প্রযুক্তির মাধ্যমে কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে ছোট বার্তা, জিপিএস অবস্থান এবং জরুরি সংকেত পাঠানো সম্ভব বলে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ধারণা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ ব্যবস্থায় সিমকার্ড বা প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্কের প্রয়োজন হয় না।
বন্দুকযুদ্ধের পর উদ্ধার যোগাযোগযন্ত্র
২৯ সেপ্টেম্বর বুদগামে একটি বন্দুকযুদ্ধের পর এসব যোগাযোগযন্ত্র সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায় নিরাপত্তা বাহিনী। গুরওয়াতকালানে ওই অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে লস্কর-ই-তইবার কমান্ডার মোহাম্মদ আসিফ ওরফে হাশিম মুসা ফৌজি নিহত হন।
তার কাছ থেকে কালো রঙের একটি শক্তপোক্ত যোগাযোগযন্ত্র উদ্ধার করা হয়। ডিভাইসটিতে ‘লোরা আলট্রা’ লেখা ছিল।
এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, ডিভাইসগুলো সাধারণ ওয়াকিটকির মতো নয়। এগুলো এনক্রিপ্ট করা রেডিও, যা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি এক ডিভাইস থেকে অন্য ডিভাইসে সংকেত পৌঁছে দিতে সক্ষম।
মোবাইল নজরদারি এড়িয়ে যোগাযোগ
নিরাপত্তা সংস্থার প্রযুক্তিগত নজরদারির সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের মতে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণরেখার ওপারে থাকা ব্যক্তিদের কাছেও বার্তা পাঠানো সম্ভব হতে পারে। প্রচলিত মোবাইল নজরদারিতে এ ধরনের যোগাযোগের কোনো চিহ্ন নাও পাওয়া যেতে পারে।
দাচিগাম ও পাহেলগামের মধ্যবর্তী পাহাড়ি এলাকায় ‘অপারেশন মহাদেব’ চলাকালে পহেলগাম হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজনদের খোঁজে অভিযান চালায় নিরাপত্তা বাহিনী। ওই সময় একাধিক এনক্রিপ্টেড লোরা ডিভাইস এবং সিমবিহীন একবার ব্যবহারযোগ্য ফোন উদ্ধার করা হয়।
পাকিস্তানে থাকা নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে যোগাযোগের সন্দেহ
তদন্তে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো জানতে পারে, নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের পাশাপাশি পাকিস্তানে অবস্থানরত নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গেও যোগাযোগের জন্য এসব ডিভাইস ব্যবহার করা হচ্ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক এড়িয়ে চলাই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
জাতীয় প্রযুক্তিগত গবেষণা সংস্থার ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে উদ্ধার হওয়া ডিভাইসগুলোর উৎস ও ব্যবহারের ধরন যাচাই করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা সূত্রগুলোর দাবি, ডিভাইসগুলো স্থানীয়ভাবে তৈরি নয়। এগুলো আগে থেকেই নির্দিষ্টভাবে সেট ও এনক্রিপ্ট করা ছিল। সীমান্তের ওপারে থাকা নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্যই এগুলো প্রস্তুত করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বদলাচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি
নতুন এই যোগাযোগব্যবস্থা শনাক্ত ও মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনীও তাদের নজরদারি পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনছে। দক্ষিণ কাশ্মীরের জঙ্গলাঞ্চলে লোরা প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত রেডিও সংকেত শনাক্ত করতে বিভিন্ন সরঞ্জাম ও ব্যবস্থা নতুন করে সাজানো হচ্ছে।
এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এখন শুধু সিমকার্ড বা মোবাইল ফোনের ওপর নজর রাখলেই হবে না। প্রচলিত নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা সিমবিহীন রেডিও যোগাযোগ শনাক্ত করাও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদকের নাম 
























