
একসময় আরবের বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে অবাধে বিচরণ করত অনাগার—বন্য গাধার একটি বিরল প্রজাতি। আরবের প্রাচীন কবিতাতেও জায়গা করে নিয়েছিল এই প্রাণী। কিন্তু শিকার ও আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে প্রায় এক শতাব্দী আগে সৌদি আরব থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় অনাগার।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর সেই প্রাণী আবার ফিরেছে সৌদির মরুভূমিতে। শুধু ফিরেই নয়, দেশটির মাটিতেই জন্ম নিয়েছে একটি অনাগার শাবক। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে এটিকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সৌদি আরবের প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান রয়্যাল রিজার্ভে জন্ম নেওয়া পুরুষ শাবকটির জন্ম ২০২৫ সালের জুনে। তবে অনাগার শাবকদের জীবনের প্রথম বছরটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এতদিন বিষয়টি প্রকাশ করা হয়নি। শাবকটি নিরাপদে প্রথম ১২ মাস পার করার পর সম্প্রতি তার জন্মের খবর প্রকাশ করা হয়।
রিজার্ভের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ড্রু জালুমিস বলেন, হাজার বছর আগে আরবের কবিতায় যে প্রাণীর প্রশংসা করা হতো, প্রায় ১০০ বছর পর সেই প্রাণী আবার সৌদির মরুভূমিতে ফিরেছে। তার মতে, এটি শুধু একটি প্রাণীর জন্মের ঘটনা নয়; বরং প্রকৃতি ও ঐতিহ্য ফিরে পাওয়ারও প্রতীক।
জর্ডান থেকে সৌদিতে ফিরল অনাগার
অনাগার পুনর্বাসনের উদ্যোগ শুরু হয় ২০২৪ সালে। ওই বছর জর্ডানের শওমারি ওয়াইল্ডলাইফ রিজার্ভ থেকে সাতটি অনাগার সৌদি আরবে আনা হয়। এর মধ্যে ছিল পাঁচটি স্ত্রী ও দুটি পুরুষ প্রাণী। প্রায় ৯৩৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তাদের সৌদির রিজার্ভে নেওয়া হয়।
সৌদিতে পৌঁছানোর পর একটি স্ত্রী অনাগার শাবকের জন্ম দেয়। পরে আরও দুটি গর্ভধারণ সফল হয়নি। এর মধ্যে একটি ঘটনায় একটি স্ত্রী অনাগারের মৃত্যু হয়।
বর্তমানে রিজার্ভে প্রাপ্তবয়স্ক প্রাণীসহ পাঁচটি স্ত্রী ও তিনটি পুরুষ অনাগার রয়েছে। আরও দুটি স্ত্রী অনাগার গর্ভবতী। আগামী শীত মৌসুমে তাদের শাবক জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জন্মের পরপরই দাঁড়াতে হয় শাবককে
অনাগার শাবকের জন্মপ্রক্রিয়াও বেশ কঠিন। প্রায় ১১ মাস মায়ের গর্ভে থাকার পর জন্মের মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যেই শাবককে দাঁড়াতে হয়।
জন্মের পরপরই মায়ের দুধ পান করা শুরু করে শাবক। বিশেষ করে মায়ের প্রথম দুধ বা শালদুধ তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি এবং বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পারস্য অনাগার বর্তমানে বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে। বন্য পরিবেশে এদের সংখ্যা ৬০০টিরও কম বলে ধারণা করা হয়। ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএন প্রাণীটির এই উপপ্রজাতিকে ‘চরম বিপন্ন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
শুধু অনাগার নয়, ফিরছে মরুভূমির বাস্তুতন্ত্র
সৌদি আরবের ‘রিওয়াইল্ড অ্যারাবিয়া’ কর্মসূচির লক্ষ্য শুধু অনাগারকে ফিরিয়ে আনা নয়। আরব অঞ্চলের ঐতিহাসিক ২৩টি স্থানীয় প্রজাতিকে তাদের পুরোনো আবাসস্থলে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি প্রজাতি ইতোমধ্যে পুনর্বাসন করা হয়েছে।
সংরক্ষণবিদদের মতে, অনাগারের বংশবিস্তার নিশ্চিত করতে শুধু প্রাণীটিকে সুরক্ষা দিলেই হবে না। প্রয়োজন উন্মুক্ত মরুভূমি, পর্যাপ্ত স্থানীয় উদ্ভিদ এবং বন্যপ্রাণীর চলাচলের নিরাপদ পথ। তাই অনাগারের প্রজননকে পুরো বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একসময় আরবের কবিতায় অনাগার ছিল স্বাধীনতা ও বন্য জীবনের প্রতীক। প্রায় এক শতাব্দী পর সেই প্রাণীই আবার সৌদির মরুভূমিতে নিজের জায়গা ফিরে পাচ্ছে।
সৌদি আরবের পরিকল্পনা অবশ্য আরও বড়। আগামী কয়েক দশকে এমন একটি প্রাকৃতিক পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে, যেখানে অনাগারের পাশাপাশি আরবীয় চিতাবাঘ, চিতা ও সিংহের মতো শিকারি প্রাণীরাও তাদের ঐতিহাসিক আবাসস্থলে ফিরে আসতে পারে।
সূত্র: আরব নিউজ
প্রতিবেদকের নাম 



















