নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৬৭৬ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ৩ হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। নেপাল সরকারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রোববার (৩০ আগস্ট) সকাল পর্যন্ত দেশটির বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকা থেকে ৬৬৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি প্রশমন ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৪২৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। এ ছাড়া বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা থেকে ৩ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, চীনের তিব্বত অঞ্চলে আরও সাতজনের মৃত্যু এবং ৫৫৪ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। দুই অঞ্চল মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ৬৭৬ এবং নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজারে পৌঁছেছে।
বৃষ্টিতে ব্যাহত উদ্ধার তৎপরতা
নেপালের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম নুয়াকোটে শনিবার সকাল থেকে খারাপ আবহাওয়ার কারণে হেলিকপ্টারভিত্তিক উদ্ধার অভিযান বাধাগ্রস্ত হয়। পরে আবহাওয়া কিছুটা স্বাভাবিক হলে আবারও আকাশপথে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করা হয়।
নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজারাম বাসনেত জানান, দুর্গতদের জন্য হেলিকপ্টারে করে পোশাক, চাল, বিস্কুট ও ইনস্ট্যান্ট নুডলসসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হচ্ছে। একই সঙ্গে অন্য হেলিকপ্টারে উদ্ধার করা মানুষদের নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ত্রিশুলি নদীর কাছের একটি জনপদ থেকেও কয়েকজনকে হেলিকপ্টারে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে শিশু ও বয়স্করাও রয়েছেন। নিরাপদ স্থানে নেওয়ার পর তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন চিকিৎসকরা।
স্বজনের খোঁজে হাসপাতাল ও ত্রাণকেন্দ্রে ভিড়
বন্যার ভয়াবহতা কমলেও অনেক মানুষ নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িতে ফিরে যাচ্ছেন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উদ্ধারের জন্য। এমন পরিস্থিতিতে স্বজন হারানো মানুষের উৎকণ্ঠাও বাড়ছে।
কেউ কেউ আবার দুর্যোগের সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া পোষা প্রাণীর খোঁজেও এলাকায় ফিরছেন। স্থানীয় বাসিন্দা শোভা শ্রেষ্ঠা বন্যার সময় ফেলে যাওয়া তার কুকুরটিকে খুঁজে বের করে ফিরে পান।
এদিকে রাজধানী কাঠমান্ডুর প্রধান সরকারি হাসপাতালের বাইরে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে মানুষের ভিড় দেখা গেছে। হাতে ছবি নিয়ে অনেকে হাসপাতালের সহায়তা ডেস্ক ও নোটিশ বোর্ডে প্রিয়জনের তথ্য খুঁজছেন।
নিরাপত্তা কর্মকর্তা গজেন্দ্র রাওয়াত জানান, দুর্যোগের পর থেকে হাসপাতালের সহায়তা ডেস্কে প্রায় ১ হাজার ৬০০ নিখোঁজ ব্যক্তির তথ্য নথিভুক্ত করেছেন স্বজনরা। হাসপাতালের দেয়ালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ছবি ও যোগাযোগের তথ্যের পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের ছবিও টানানো হয়েছে।
নুয়াকোটের একটি ত্রাণকেন্দ্রেও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে নিহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।
সুড়ঙ্গে শতাধিক মানুষ আটকা পড়ার আশঙ্কা
রাসুওয়া জেলার আপার ত্রিশুলি-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সেনাবাহিনীর মুখপাত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণস্থলের কাদায় ভরা সুড়ঙ্গে ১০০ জনের বেশি মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন।
উদ্ধারকারীরা দড়ি ও ঝুড়ির সাহায্যে কয়েকজনকে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছেন। তবে সুড়ঙ্গের ভেতরে কয়েক ফুট গভীর কাদা জমে থাকায় উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া হেলিকপ্টার নামানোর জন্য পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় আকাশপথের সহায়তাও সীমিত।
নতুন হ্রদ ঘিরে ফের বন্যার শঙ্কা
প্রাথমিক বন্যার পর হিমালয়ের উঁচু এলাকায় হিমবাহ ধসের কারণে একটি নতুন হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। হ্রদটির পানি উপচে পড়লে আবারও বন্যা দেখা দিতে পারে—এমন আশঙ্কায় উদ্ধারকর্মীদের সতর্ক রাখা হয়েছে।
তবে চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যের বরাত দিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, শুক্রবার রাত নাগাদ হ্রদটির আয়তন কমেছে। বৃহস্পতিবার সকালে সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছানোর পর পানির স্তর প্রায় ১০ মিটার বা ৩২ ফুট কমে গেছে।
তিব্বতের গিরং সীমান্ত এলাকাতেও উদ্ধারকারীরা দুর্গম অঞ্চলে অভিযান চালাচ্ছেন। কেউ হেঁটে, কেউ ভেলায় এবং কেউ ড্রোনের সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
আন্তর্জাতিক সহায়তা জোরদার
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, নিখোঁজদের সন্ধান, উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সরকারের সব ধরনের সম্পদ কাজে লাগানো হচ্ছে।
দুর্গত এলাকার দুর্গম পাহাড় ও সরু গিরিখাতের কারণে উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে বলে জানান তিনি। নিখোঁজদের উদ্ধারে সুড়ঙ্গ উদ্ধার প্রযুক্তি, জীবিতদের শনাক্তকরণ, দ্রুত ফরেনসিক ও ডিএনএ বিশ্লেষণ এবং মরদেহ সংরক্ষণের জন্য বিশেষায়িত সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
ভারত থেকে ১১ সদস্যের একটি সুড়ঙ্গ উদ্ধারকারী দল নেপালে কাজ শুরু করেছে। চীন থেকেও একই ধরনের একটি দল আসার কথা রয়েছে। ভারত এরই মধ্যে ৫৭ টনের বেশি ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে। পাশাপাশি চীন, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকেও সহায়তা আসছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, বন্যায় নেপালের চারটি জেলা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশের অন্যান্য অঞ্চল বিদেশি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।
প্রতিবেদকের নাম 



















