
উত্তরাঞ্চলের নারী শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষায় নতুন দিগন্তের সূচনায় চালু হচ্ছে রংপুর সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। আধুনিক অবকাঠামো, আবাসিক সুবিধা, উন্নত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা ও দক্ষ শিক্ষক নিয়ে চলতি শিক্ষাবর্ষেই প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।
প্রথম ধাপে গ্রাফিক ডিজাইন ও আর্কিটেকচার টেকনোলজিতে ৫০ জন করে মোট ১০০ ছাত্রী ভর্তি করা হবে। সে লক্ষ্যে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে প্রথম শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা। অক্টোবর থেকে ক্লাস শুরু হবে বলে জানিয়েছেন অধ্যক্ষ আসাদুজ্জামান।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রংপুর বিভাগের নারীদের কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করে তোলা এবং দেশ-বিদেশের শ্রমবাজারের উপযোগী জনশক্তি তৈরিতে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি আত্মকর্মসংস্থানেরও নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
স্থানীয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রংপুর নগরীর শালবন মিস্ত্রিপাড়া এলাকায় প্রায় ৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে তিন একর জমির ওপর নির্মাণ করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির আধুনিক ক্যাম্পাস। আগে জায়গাটি রংপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধীনে ছিল। সরকারি অর্থায়নে ‘চারটি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপনা’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় রংপুর ছাড়াও সিলেট, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহরে চারটি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট নির্মাণ করা হচ্ছে।
নতুন ক্যাম্পাসে রয়েছে ছয়তলা একাডেমিক ভবন, প্রশাসনিক ভবন ও চারতলা ছাত্রীনিবাস। ২০০ আসনের ছাত্রীনিবাসে রয়েছে পাঁচটি পৃথক ব্লক। শিক্ষার্থীদের জন্য রিডিং রুম, টিভি রুম ও ডাইনিং রুমের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষকদের ডরমেটরি, অভ্যন্তরীণ সড়ক, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও সাব-স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের জন্য নির্মাণ করা হবে একটি অত্যাধুনিক ওয়ার্কশপ ভবন।
আন্তর্জাতিকমানের যন্ত্রপাতিতে সজ্জিত এ ওয়ার্কশপে বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির নির্মাণকাজের প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে।
রংপুর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী রথিশ চন্দ্র সেন বলেন, প্রতিষ্ঠানটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। বাকি কাজ আগামী অক্টোবরের মধ্যে পুরোপুরি শেষ হবে।
এদিকে শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতিও এগিয়ে চলছে। ইতিমধ্যে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ২০ জন শিক্ষক যোগদান করেছেন। চলতি মাসের মধ্যেই পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, রংপুরে এমন একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন উত্তরাঞ্চলের নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বড় সুযোগ। নগরীর শালবন এলাকার বাসিন্দা আবদুল কাদের বলেন, মেয়েদের জন্য আলাদা সরকারি পলিটেকনিক হওয়ায় এখন অনেক পরিবার নিশ্চিন্তে সন্তানদের কারিগরি শিক্ষায় পড়াতে পারবে। আবাসিক সুবিধা থাকায় দূরের শিক্ষার্থীরাও এখানে পড়ার সুযোগ পাবে।
একই এলাকার বাসিন্দা রেহানা বেগম বলেন, বর্তমানে শুধু সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত হলেই চাকরি পাওয়া কঠিন। মেয়েদের যদি কারিগরি দক্ষতা থাকে, তাহলে চাকরির পাশাপাশি নিজেরাও কিছু করতে পারবে। এই প্রতিষ্ঠান রংপুরের মেয়েদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করবে।
সচেতন মহল মনে করছে, রংপুর সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট চালুর মধ্য দিয়ে উত্তরাঞ্চলের নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কারিগরি শিক্ষার নতুন দুয়ার খুলবে। আধুনিক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ নারী জনশক্তি তৈরি হলে দেশের শিল্প, প্রযুক্তি ও সেবা খাতে নারীদের অংশগ্রহণ আরো বাড়বে। একই সঙ্গে দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থান এবং উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রংপুর সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ আসাদুজ্জামান বলেন, ‘২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্রীরা অনলাইনে আবেদনের সুযোগ পাবেন। আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। অক্টোবর থেকে ক্লাস শুরু হবে।
তিনি আরো বলেন, প্রথম পর্যায়ে গ্রাফিক ডিজাইন ও আর্কিটেকচার টেকনোলজিতে ৫০ জন করে মোট ১০০ ছাত্রী ভর্তি করা হবে। আগামী শিক্ষাবর্ষে আরো দুটি নতুন ট্রেড যুক্ত করে শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ানো হবে। ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের প্রতি সেমিস্টারে বৃত্তি দেওয়া হবে। ডিপ্লোমা সম্পন্ন করার পর চাকরি নিয়ে যাতে তাদের দুশ্চিন্তা করতে না হয়, সে জন্য দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠান থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন রংপুর মহানগরের সভাপতি অ্যাডভোকেট জোবাইদুর ইসলাম বুলেট বলেন, দেশে ও বিদেশে বর্তমান এবং ভবিষ্যতের চাকরির বাজারের চাহিদার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির লক্ষ্যে এই মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট নতুন মাত্রা যোগ করবে। সরকার কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং নারীদের অগ্রাধিকার সম্প্রসারণে যেভাবে কাজ করছে, এটি তারই প্রতিচ্ছবি।
তিনি বলেন, রংপুর বিভাগের মানুষের জন্য এটি অনেক বড় পাওয়া। কারণ এই অঞ্চলে এটিই প্রথম সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।
Arif 



















