ঢাকা ০৪:৪২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
মাদক-জুয়া ও অপরাধে জিরো টলারেন্স, কঠোর বার্তা স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর অটোভ্যান ছিনতাইয়ের জন্য কিশোরকে হত্যা, জঙ্গলে মিলল দেহাবশেষ; গ্রেফতার ২ শিক্ষার্থীদের আবদার শুনতে বাস থামালেন প্রধানমন্ত্রী, তুললেন সেলফি ও দিলেন উপহার হাড়ক্ষয় প্রতিরোধে দেশজুড়ে সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জুবাইদা রহমানের ২০০ কোটি ডলারের সহায়তা চাওয়ার পরিকল্পনা, ২৬ অক্টোবর জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গেলেই ব্যবস্থা, নেতাকর্মীদের কড়া বার্তা আইনমন্ত্রীর ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চাই: প্রধানমন্ত্রী ভারতের প্রধান নির্বাচক প্রজ্ঞান ওঝা, নিয়োগ ঘিরে বিতর্ক ‘আমার কপালে সারাজীবন ঝামেলাই লেখা’: পরীমনি এফডিআই বাড়লেও নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ৪.৭৭ শতাংশ
বিজ্ঞাপন:
📰 Dainikbishawsongbad.com— দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ খবর, ব্রেকিং নিউজ, রাজনীতি, খেলাধুলা, বিনোদন, আন্তর্জাতিক সংবাদ ও গুরুত্বপূর্ণ সকল আপডেট পেতে প্রতিদিন ভিজিট করুন 🌍 নির্ভরযোগ্য ও দ্রুত সংবাদ পরিবেশনে আমরা সবসময় আপনার পাশে। 📢 আপনার ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের প্রচারের জন্য ব্যানার বিজ্ঞাপন ও স্পন্সর পোস্ট সুবিধা রয়েছে। 🌐 DainikBishwaSongbad.com

চট্টগ্রাম বন্দরে ৩২৩ টিইইউ বিপজ্জনক রাসায়নিক, বৈরুতের মতো দুর্ঘটনার শঙ্কা

  • প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেটের সময়: ০৮:১৫:০৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
  • ২৩ সময় দেখুন

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে বছরের পর বছর ধরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে ৩২৩ টিইইউ বিপজ্জনক রাসায়নিকবোঝাই কনটেইনার। এর মধ্যে ৪৪টি কনটেইনার জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো কনটেইনার থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে আসায় অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ ও পরিবেশদূষণের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

২০২০ সালে লেবাননের বৈরুত বন্দরে অনিরাপদভাবে মজুত রাখা অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের বিস্ফোরণে তিন বাংলাদেশিসহ ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে বিপজ্জনক রাসায়নিক জমে থাকা এবং কনটেইনারগুলোর বেহাল দশা নতুন করে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

১৫ থেকে ২০ বছরের পুরোনো কনটেইনার

বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ড ও জেটিতে পড়ে থাকা এসব কনটেইনারের কোনো কোনোটি ১৫ থেকে ২০ বছরের পুরোনো। এগুলোতে অ্যাসিড, মিথানল, থিনারসহ বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যথাযথভাবে নিষ্পত্তি না করায় কনটেইনারের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার রাসেল আহমেদ বলেন, এসব রাসায়নিক উচ্চ অগ্নিঝুঁকিসম্পন্ন। স্বাভাবিকভাবেই এগুলো দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর সাইফুল ইসলাম রনি বলেন, যেকোনো সময় এসব কনটেইনারে আগুন লাগতে পারে বা বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। আগুন লাগলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে। কারণ, বন্দর একটি বন্ডেড এলাকা, যেখানে এসব রাসায়নিকের পাশাপাশি আরও বিভিন্ন ধরনের পণ্য রয়েছে।

আগুন ছড়ালে ব্যাহত হতে পারে বন্দরের কার্যক্রম

চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আমদানি-রপ্তানি পণ্য ওঠানামা করে। বিভিন্ন ধরনের পণ্য, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোর কাছাকাছি বিপজ্জনক রাসায়নিক থাকায় কোনো একটি কনটেইনারে আগুন লাগলে তা আশপাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে পণ্য ও অবকাঠামোর ক্ষতির পাশাপাশি বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  ‘সবার জন্য বাংলাদেশ গড়তে তরুণদেরই এগিয়ে আসতে হবে’: প্রধানমন্ত্রী

রাসায়নিকের ধরন অনুযায়ী বিষাক্ত বাষ্প ছড়িয়ে পড়তে পারে। দূষিত হতে পারে আশপাশের মাটি ও পানি। বিশেষ করে জরাজীর্ণ কনটেইনার থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে এলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, আমদানিকারকদের পণ্য খালাস না করা, নিলামপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এবং আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বছরের পর বছর এসব রাসায়নিক বন্দরে পড়ে রয়েছে। আমদানির ৩০ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস না করায় নিলামের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

তবে বিপজ্জনক রাসায়নিকের ক্ষেত্রে সাধারণ পণ্যের মতো নিলামপ্রক্রিয়া অনুসরণ করলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। রাসায়নিকের ধরন, ব্যবহারযোগ্যতা, সংরক্ষণের অবস্থা ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সেগুলো নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।

রাসায়নিক ধ্বংসে উদ্যোগ, তবে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে

বন্দরে পড়ে থাকা বিপজ্জনক রাসায়নিক অপসারণে সম্প্রতি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে নয়টি কনটেইনার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেডের কারখানায় ধ্বংসের জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। এসব কনটেইনারে মোট ১৫০ দশমিক ৮৯ টন রাসায়নিক ছিল। এর মধ্যে ২৫ দশমিক ৫৫ টন সালফিউরিক অ্যাসিড, ৫০০ কেজি নাইট্রিক অ্যাসিড, ৯২ দশমিক ৫৪ টন মিথানল এবং ৩২ দশমিক ৩০ টন থিনার রয়েছে।

তবে রাসায়নিক পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি কাভার্ড ভ্যানে আগুন লাগার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, গাড়িতে থাকা ড্রামগুলো খালি ছিল এবং প্রাথমিকভাবে ইঞ্জিন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তাই ঘটনাটিকে রাসায়নিকের বিস্ফোরণ হিসেবে বর্ণনা করার ভিত্তি নেই। তবে বিপজ্জনক পণ্য পরিবহনে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার গুরুত্ব আবারও সামনে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পরীক্ষামূলকভাবে ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেডের কারখানায় আটটি কনটেইনারের রাসায়নিক ধ্বংসের প্রক্রিয়া সফল হয়েছে। কিন্তু বন্দরে পড়ে থাকা বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক নিরাপদে নিষ্পত্তি করতে আরও বড় পরিসরের সক্ষমতা ও উপযুক্ত স্থাপনা প্রয়োজন। তাই অবশিষ্ট রাসায়নিকের ধরন ও পরিমাণ নির্ধারণ করে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুনঃ  নিরাপদ সড়ক গড়তে শিক্ষার্থীদেরও আইন মানতে হবে

নিলাম ও নিষ্পত্তিতে সমন্বিত উদ্যোগ

জরাজীর্ণ কনটেইনারে থাকা বিপজ্জনক রাসায়নিক নিলামে বিক্রি না করে বন্দরে ফেলে রাখায় অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি বাড়ছে—এমন উদ্বেগ জানিয়ে কাস্টম কমিশনারকে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এসব পণ্য দ্রুত সরিয়ে ঝুঁকি কমানো এখন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে এসব পণ্য নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা অনুযায়ী পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) অনুসরণ করে নিলামপ্রক্রিয়ায় যাওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ব্যবহারযোগ্য রাসায়নিক আইনানুগভাবে নিলামে বিক্রি করা যেতে পারে। অন্যদিকে মেয়াদোত্তীর্ণ, ব্যবহার অনুপযোগী বা অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক উপযুক্ত স্থাপনায় নিরাপদে ধ্বংস করতে হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি পরিবেশ ও জননিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, বন্দরে ৩০০ টিইইউর বেশি বিপজ্জনক পণ্য রয়েছে। এসব পণ্য বন্দর থেকে সরিয়ে নিতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করা হচ্ছে এবং তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হচ্ছে।

পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভীন বলেন, বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে বিপজ্জনক রাসায়নিক পড়ে থাকা এবং জরাজীর্ণ কনটেইনার থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে আসার বিষয়টি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। এসব রাসায়নিকের কারণে মাটি, পানি ও বায়ুদূষণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

আরও পড়ুনঃ  এক অনলাইন পোর্টালেই মিলবে ট্রেড লাইসেন্স, জানালেন বাণিজ্যমন্ত্রী

তিনি বলেন, রাসায়নিকের ধরন ও ঝুঁকি নিরূপণ করে পরিবেশগত আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করে দ্রুত নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কনটেইনার নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, সম্ভাব্য দূষণ প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপজ্জনক রাসায়নিকের ঝুঁকি শুধু আগুন বা বিস্ফোরণে সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষতিগ্রস্ত কনটেইনার থেকে অ্যাসিড বা অন্য রাসায়নিক বেরিয়ে এলে আশপাশের মাটি ও পানি দূষিত হতে পারে। কিছু রাসায়নিকের বাষ্প মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আবার দাহ্য রাসায়নিকের ক্ষেত্রে আগুনের সামান্য উৎস থেকেও বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

এ কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কনটেইনার শনাক্ত করা, রাসায়নিকের প্রকৃতি নির্ধারণ, নিরাপদে সংরক্ষণ এবং পরিবেশসম্মত উপায়ে ধ্বংস করার ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিস্ফোরক অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের সাবেক সহকারী পরিদর্শক এস এম শাখাওয়াত হোসেন বলেন, বিপজ্জনক রাসায়নিক দীর্ঘদিন ধরে বন্দরে পড়ে থাকা এবং জরাজীর্ণ কনটেইনারে সংরক্ষিত থাকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, রাসায়নিকের ধরন, সংরক্ষণব্যবস্থা ও বর্তমান অবস্থা যাচাই করে সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরূপণ করা জরুরি। বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত কনটেইনার থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে আসার ঘটনা থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে দ্রুত নিরাপদ সংরক্ষণ ও বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে অগ্নিকাণ্ড, দুর্ঘটনা ও পরিবেশদূষণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।

দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরে বছরের পর বছর বিপজ্জনক রাসায়নিক পড়ে থাকা এখন শুধু পণ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়; এটি বন্দর নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। ঝুঁকিপূর্ণ কনটেইনারগুলো দ্রুত শনাক্ত করে নিরাপদ ব্যবস্থাপনা ও নিষ্পত্তি নিশ্চিত করাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

T ag

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় পোস্ট

মাদক-জুয়া ও অপরাধে জিরো টলারেন্স, কঠোর বার্তা স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর

চট্টগ্রাম বন্দরে ৩২৩ টিইইউ বিপজ্জনক রাসায়নিক, বৈরুতের মতো দুর্ঘটনার শঙ্কা

আপডেটের সময়: ০৮:১৫:০৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে বছরের পর বছর ধরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে ৩২৩ টিইইউ বিপজ্জনক রাসায়নিকবোঝাই কনটেইনার। এর মধ্যে ৪৪টি কনটেইনার জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো কনটেইনার থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে আসায় অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ ও পরিবেশদূষণের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

২০২০ সালে লেবাননের বৈরুত বন্দরে অনিরাপদভাবে মজুত রাখা অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের বিস্ফোরণে তিন বাংলাদেশিসহ ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে বিপজ্জনক রাসায়নিক জমে থাকা এবং কনটেইনারগুলোর বেহাল দশা নতুন করে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

১৫ থেকে ২০ বছরের পুরোনো কনটেইনার

বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ড ও জেটিতে পড়ে থাকা এসব কনটেইনারের কোনো কোনোটি ১৫ থেকে ২০ বছরের পুরোনো। এগুলোতে অ্যাসিড, মিথানল, থিনারসহ বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যথাযথভাবে নিষ্পত্তি না করায় কনটেইনারের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার রাসেল আহমেদ বলেন, এসব রাসায়নিক উচ্চ অগ্নিঝুঁকিসম্পন্ন। স্বাভাবিকভাবেই এগুলো দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর সাইফুল ইসলাম রনি বলেন, যেকোনো সময় এসব কনটেইনারে আগুন লাগতে পারে বা বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। আগুন লাগলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে। কারণ, বন্দর একটি বন্ডেড এলাকা, যেখানে এসব রাসায়নিকের পাশাপাশি আরও বিভিন্ন ধরনের পণ্য রয়েছে।

আগুন ছড়ালে ব্যাহত হতে পারে বন্দরের কার্যক্রম

চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আমদানি-রপ্তানি পণ্য ওঠানামা করে। বিভিন্ন ধরনের পণ্য, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোর কাছাকাছি বিপজ্জনক রাসায়নিক থাকায় কোনো একটি কনটেইনারে আগুন লাগলে তা আশপাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে পণ্য ও অবকাঠামোর ক্ষতির পাশাপাশি বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের এক বছর পূর্ণ আজ

রাসায়নিকের ধরন অনুযায়ী বিষাক্ত বাষ্প ছড়িয়ে পড়তে পারে। দূষিত হতে পারে আশপাশের মাটি ও পানি। বিশেষ করে জরাজীর্ণ কনটেইনার থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে এলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, আমদানিকারকদের পণ্য খালাস না করা, নিলামপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এবং আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বছরের পর বছর এসব রাসায়নিক বন্দরে পড়ে রয়েছে। আমদানির ৩০ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস না করায় নিলামের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

তবে বিপজ্জনক রাসায়নিকের ক্ষেত্রে সাধারণ পণ্যের মতো নিলামপ্রক্রিয়া অনুসরণ করলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। রাসায়নিকের ধরন, ব্যবহারযোগ্যতা, সংরক্ষণের অবস্থা ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সেগুলো নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।

রাসায়নিক ধ্বংসে উদ্যোগ, তবে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে

বন্দরে পড়ে থাকা বিপজ্জনক রাসায়নিক অপসারণে সম্প্রতি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে নয়টি কনটেইনার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেডের কারখানায় ধ্বংসের জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। এসব কনটেইনারে মোট ১৫০ দশমিক ৮৯ টন রাসায়নিক ছিল। এর মধ্যে ২৫ দশমিক ৫৫ টন সালফিউরিক অ্যাসিড, ৫০০ কেজি নাইট্রিক অ্যাসিড, ৯২ দশমিক ৫৪ টন মিথানল এবং ৩২ দশমিক ৩০ টন থিনার রয়েছে।

তবে রাসায়নিক পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি কাভার্ড ভ্যানে আগুন লাগার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, গাড়িতে থাকা ড্রামগুলো খালি ছিল এবং প্রাথমিকভাবে ইঞ্জিন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তাই ঘটনাটিকে রাসায়নিকের বিস্ফোরণ হিসেবে বর্ণনা করার ভিত্তি নেই। তবে বিপজ্জনক পণ্য পরিবহনে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার গুরুত্ব আবারও সামনে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পরীক্ষামূলকভাবে ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেডের কারখানায় আটটি কনটেইনারের রাসায়নিক ধ্বংসের প্রক্রিয়া সফল হয়েছে। কিন্তু বন্দরে পড়ে থাকা বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক নিরাপদে নিষ্পত্তি করতে আরও বড় পরিসরের সক্ষমতা ও উপযুক্ত স্থাপনা প্রয়োজন। তাই অবশিষ্ট রাসায়নিকের ধরন ও পরিমাণ নির্ধারণ করে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুনঃ  ইশরাকের পদত্যাগের ব্যাখ্যা চাইলেন নাহিদ ইসলাম

নিলাম ও নিষ্পত্তিতে সমন্বিত উদ্যোগ

জরাজীর্ণ কনটেইনারে থাকা বিপজ্জনক রাসায়নিক নিলামে বিক্রি না করে বন্দরে ফেলে রাখায় অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি বাড়ছে—এমন উদ্বেগ জানিয়ে কাস্টম কমিশনারকে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এসব পণ্য দ্রুত সরিয়ে ঝুঁকি কমানো এখন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে এসব পণ্য নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা অনুযায়ী পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) অনুসরণ করে নিলামপ্রক্রিয়ায় যাওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ব্যবহারযোগ্য রাসায়নিক আইনানুগভাবে নিলামে বিক্রি করা যেতে পারে। অন্যদিকে মেয়াদোত্তীর্ণ, ব্যবহার অনুপযোগী বা অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক উপযুক্ত স্থাপনায় নিরাপদে ধ্বংস করতে হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি পরিবেশ ও জননিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, বন্দরে ৩০০ টিইইউর বেশি বিপজ্জনক পণ্য রয়েছে। এসব পণ্য বন্দর থেকে সরিয়ে নিতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করা হচ্ছে এবং তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হচ্ছে।

পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভীন বলেন, বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে বিপজ্জনক রাসায়নিক পড়ে থাকা এবং জরাজীর্ণ কনটেইনার থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে আসার বিষয়টি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। এসব রাসায়নিকের কারণে মাটি, পানি ও বায়ুদূষণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

আরও পড়ুনঃ  হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ জনের মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ১১৮৯

তিনি বলেন, রাসায়নিকের ধরন ও ঝুঁকি নিরূপণ করে পরিবেশগত আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করে দ্রুত নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কনটেইনার নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, সম্ভাব্য দূষণ প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপজ্জনক রাসায়নিকের ঝুঁকি শুধু আগুন বা বিস্ফোরণে সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষতিগ্রস্ত কনটেইনার থেকে অ্যাসিড বা অন্য রাসায়নিক বেরিয়ে এলে আশপাশের মাটি ও পানি দূষিত হতে পারে। কিছু রাসায়নিকের বাষ্প মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আবার দাহ্য রাসায়নিকের ক্ষেত্রে আগুনের সামান্য উৎস থেকেও বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

এ কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কনটেইনার শনাক্ত করা, রাসায়নিকের প্রকৃতি নির্ধারণ, নিরাপদে সংরক্ষণ এবং পরিবেশসম্মত উপায়ে ধ্বংস করার ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিস্ফোরক অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের সাবেক সহকারী পরিদর্শক এস এম শাখাওয়াত হোসেন বলেন, বিপজ্জনক রাসায়নিক দীর্ঘদিন ধরে বন্দরে পড়ে থাকা এবং জরাজীর্ণ কনটেইনারে সংরক্ষিত থাকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, রাসায়নিকের ধরন, সংরক্ষণব্যবস্থা ও বর্তমান অবস্থা যাচাই করে সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরূপণ করা জরুরি। বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত কনটেইনার থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে আসার ঘটনা থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে দ্রুত নিরাপদ সংরক্ষণ ও বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে অগ্নিকাণ্ড, দুর্ঘটনা ও পরিবেশদূষণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।

দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরে বছরের পর বছর বিপজ্জনক রাসায়নিক পড়ে থাকা এখন শুধু পণ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়; এটি বন্দর নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। ঝুঁকিপূর্ণ কনটেইনারগুলো দ্রুত শনাক্ত করে নিরাপদ ব্যবস্থাপনা ও নিষ্পত্তি নিশ্চিত করাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ।