টানা বৃষ্টি ও ভাইরাসের সংক্রমণে বাগেরহাটের মোংলা উপজেলায় বাগদা চিংড়িতে ব্যাপক মড়ক দেখা দিয়েছে। গত এক মাস ধরে বিভিন্ন ঘেরে বিপুল পরিমাণ চিংড়ি মারা যাওয়ায় চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন চাষিরা। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এ বিপর্যয়ের কারণে চলতি মৌসুমে চিংড়ির উৎপাদন গত বছরের তুলনায় অর্ধেকেরও নিচে নেমে আসতে পারে।
উপজেলা মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, লবণাক্ত পানির এই অঞ্চলে প্রায় চার দশক ধরে কৃষকেরা ধানের পরিবর্তে বছরের প্রায় আট মাস চিংড়ি চাষ করে আসছেন। মোংলার মোট ১৪ হাজার ৫০০ হেক্টর কৃষিজমির মধ্যে ১৩ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে বাগদা চিংড়ির চাষ হয়। ছোট-বড় মিলিয়ে উপজেলায় ঘেরের সংখ্যা ৬ হাজার ৭০টি। স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান এই খাত এখন বড় ধরনের সংকটের মুখে।
চাঁদপাই, সুন্দরবন, মালগাজী ও হলদিবুনিয়া এলাকার চাষিরা জানান, গত জুন থেকে টানা বৃষ্টি ও ভাইরাসের কারণে ঘেরে চিংড়ি মারা যাচ্ছে। মরা চিংড়িগুলো লালচে হয়ে পানির ওপর ভেসে উঠছে। যে সামান্য চিংড়ি বেঁচে আছে, সেগুলোও দুর্বল হয়ে কাদার সঙ্গে মিশে থাকছে। ফলে ভরা মৌসুমেও অনেক ঘের প্রায় মাছশূন্য হয়ে পড়েছে।
সুন্দরবন ইউনিয়নের ঢালীরখন্ড গ্রামের চিংড়িচাষি আবুল কাসেম জানান, চলতি মৌসুমে তিনি ঘেরে প্রায় সাত লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। এ সময়ে বিনিয়োগের সিংহভাগ টাকা উঠে আসার কথা থাকলেও মড়কের কারণে এখন পর্যন্ত মাত্র এক লাখ টাকার চিংড়ি বিক্রি করতে পেরেছেন তিনি।
চিংড়ির এই বিপর্যয়ের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় আড়তগুলোতেও। উপজেলা চিংড়ি বণিক সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি ওলিয়ার খাঁ জানান, ২০২৫ সালে মোংলায় প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন বাগদা চিংড়ি উৎপাদিত হয়েছিল। কিন্তু এবার মড়কের কারণে আড়তগুলোতে চিংড়ির সরবরাহ গত বছরের তুলনায় অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের অভিযোগ, চিংড়ি রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় হলেও তাদের সংকট নিরসনে মৎস্য অধিদপ্তরের কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ঘেরে চিংড়ি মারা যাওয়ার কারণ বা প্রতিকার সম্পর্কে মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনাও দেওয়া হচ্ছে না বলে দাবি তাদের।
তবে মৎস্য দপ্তরের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মোংলা উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম। তিনি মড়কের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। হ্যাচারি থেকে আনা পোনায় আগে থেকেই জীবাণু থাকতে পারে। এ ছাড়া ঘেরে প্রয়োজনীয় তিন ফুট পানি না থাকা, মৌসুমের শুরুতে কাদা শোধন ও পর্যাপ্ত চুন ব্যবহার না করা এবং সুষম খাদ্যের অভাবে চিংড়ি দুর্বল হয়ে ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। এর সঙ্গে চলতি বছরের টানা বৃষ্টিপাতও বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, চাষিদের সচেতন করতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সেমিনারের আয়োজন করা হচ্ছে। কোনো এলাকায় মড়কের খবর পাওয়া গেলে দ্রুত সেখানে গিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ, মাঠপর্যায়ে পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
প্রতিবেদকের নাম 




















