অভিবাসন সংকটকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুই দেশ স্পেন ও ইতালির মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ইতালির পর এবার দেশটির নাগরিক ও তৃতীয় দেশের যাত্রীদের চলাচলে সাময়িক সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে স্পেন।
স্পেনের নতুন এই নিয়ন্ত্রণ গতকাল শুক্রবার গ্রিনিচ মান সময় মধ্যরাত থেকে কার্যকর হয়েছে। আগামী ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এটি বহাল থাকার কথা রয়েছে। তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে সময়সীমা পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে বলে জানিয়েছে মাদ্রিদ।
সম্প্রতি স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সেউতায় মরক্কো থেকে বিপুলসংখ্যক অভিবাসনপ্রত্যাশী প্রবেশের পর ইতালি স্পেন থেকে আসা যাত্রীদের ওপর সাময়িক সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। এর জবাবে পাল্টা ব্যবস্থা নিল স্পেন।

গত ৩০ জুলাই সকাল থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ৫০ হাজারের বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী মরক্কো থেকে সেউতায় প্রবেশ করেন। সব মিলিয়ে সম্প্রতি প্রায় ৭৮ হাজার অভিবাসী সেখানে প্রবেশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইতালির সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে মাদ্রিদ রোমকে ব্যবস্থা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছিল। তবে ইতালি তা প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, অন্তত ১৫ আগস্ট পর্যন্ত এ নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকবে। দেশটির আশঙ্কা, সেউতায় আবারও অভিবাসীদের বড় ধরনের ঢল নামতে পারে।
ইতালির সঙ্গে স্পেনের কোনো স্থলসীমান্ত নেই। রোমের যুক্তি, সেউতায় প্রবেশ করা অভিবাসীরা শেনজেন এলাকার অন্যান্য দেশে প্রবেশ করে ইতালিতে পৌঁছাতে পারেন। এ আশঙ্কায় সাময়িকভাবে শেনজেনের অবাধ চলাচলব্যবস্থায় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে ইতালি।
তবে মাদ্রিদ এ যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে। স্পেনের দাবি, সেউতায় প্রবেশ করা অভিবাসীদের শেনজেন অঞ্চলে অবাধে প্রবেশের সুযোগ নেই। ফলে ইতালির নেওয়া পদক্ষেপের বাস্তব ভিত্তি নেই বলে মনে করে স্পেন।
শুক্রবার স্পেনের হুঁশিয়ারির জবাবে ইতালি জানিয়ে দিয়েছে, তারা কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমার চাপে ব্যবস্থা প্রত্যাহার করবে না। দেশটির সরকার বলেছে, স্পেন থেকে আসা তৃতীয় দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে শেনজেন চুক্তির কিছু বিধান স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত অন্তত ১৫ আগস্ট পর্যন্ত অথবা সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত ঝুঁকি দূর না হওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে
।
তবে ইতালি জানিয়েছে, স্পেনের নাগরিকদের অতিরিক্ত তল্লাশির আওতায় আনা হবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রেই বাড়তি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে।
এদিকে স্পেনের নতুন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় ইতালি থেকে আসা যাত্রীদের পাসপোর্ট, জাতীয়তা ও ভিসা পরীক্ষা করা হবে। স্পেন সরকার বলছে, দেশটি বর্তমানে অব্যাহত অনিয়মিত অভিবাসনের চাপের মধ্যে রয়েছে। সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাময়িকভাবে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ইতালির সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের কারণে দেশটির কয়েকটি বিমানবন্দরে যাত্রীদের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে বলেও স্পেনের সংবাদমাধ্যম ‘এল পাইস’ জানিয়েছে।
সেউতার সাম্প্রতিক অভিবাসন পরিস্থিতি স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্যও সামনে এনেছে। মেলোনি দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসননীতি আরও কঠোর করার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন।
এদিকে গত সপ্তাহে সেউতায় পৌঁছানো অধিকাংশ অভিবাসীকে কয়েক দিনের মধ্যেই ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো সেখানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসী অবস্থান করছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন কমিশনার ম্যাগনুস ব্রুনারের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে অভিবাসীদের সেউতায় আসতে উৎসাহিত করার পেছনে অপরাধী চক্রের ভূমিকা থাকতে পারে। স্পেন সরকারও এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত হয়েছে।
সেউতায় বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর প্রবেশের কারণ এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি সাম্প্রতিক রায়ের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ওই রায়ে বলা হয়েছে, সেউতা বা মেলিয়ায় প্রবেশের চেষ্টা করার সময় সমুদ্রে আটক অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো যাবে না।
মরক্কো অবশ্য এই সংকটের জন্য আদালতের ওই রায়কেই দায়ী করেছে। দেশটির একটি সরকারি সূত্রের দাবি, আদালতের রায়ের কারণে অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে বিদ্যমান প্রতিরোধব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
স্পেনের সেউতা ও মেলিয়া দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির সঙ্গে মরক্কোর কূটনৈতিক বিরোধের অন্যতম বিষয়। উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত এই দুটি অঞ্চলকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে মরক্কো। অন্যদিকে স্পেন এগুলোকে নিজেদের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে পরিচালনা করে।
সূত্র: বিবিসি
প্রতিবেদকের নাম 




















