দেশে চক্ষুসেবার পরিধি বাড়ানো এবং অপটোমেট্রিস্টদের একটি সুশৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর আওতায় আনতে পৃথক অপটোমেট্রি কাউন্সিল গঠনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত হয়েছেন চক্ষুস্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা।
মঙ্গলবার রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আয়োজিত চক্ষুস্বাস্থ্যবিষয়ক এক জাতীয় সংলাপে এ মতৈক্য উঠে আসে।
সংলাপে বক্তারা বলেন, দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর চক্ষুসেবার চাহিদা পূরণে প্রয়োজনীয় জনবল ও সেবাব্যবস্থা এখনও পর্যাপ্ত নয়। এ পরিস্থিতিতে অপটোমেট্রিস্ট ও অন্যান্য সহযোগী চক্ষুসেবা কর্মীদের মূলধারার স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত করা জরুরি। তবে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত নিবন্ধন, লাইসেন্সিং, কর্মপরিধি এবং ওষুধ ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ডা. এএসএমএম কাদির বলেন, অপটোমেট্রি শিক্ষায় প্রবেশের প্রাকযোগ্যতা কী হবে, অপটোমেট্রিস্টরা ওষুধের ব্যবস্থাপত্র দিতে পারবেন কি না এবং তারা স্বাধীনভাবে কাজ করবেন নাকি চক্ষু বিশেষজ্ঞের অধীনে দায়িত্ব পালন করবেন—এসব বিষয় নির্ধারণে একটি পৃথক নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ চক্ষু চিকিৎসক সমিতির মহাসচিব অধ্যাপক মো. জিন্নু রাইন বলেন, প্রাথমিক চক্ষুসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে অপটোমেট্রিস্টদের ওষুধ ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার নির্দিষ্ট সীমারেখা থাকা উচিত। বিশেষ করে স্টেরয়েডের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ওষুধ ব্যবহারের অনুমতি তাদের দেওয়া উচিত নয় বলেও মত দেন তিনি।
বাংলাদেশ চক্ষু চিকিৎসক সমিতির সভাপতি ডা. মো. তৌহিদুর রহমান চক্ষুসেবার বিভিন্ন পর্যায়ের কোর্সে অভিন্নতা আনা এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের দায়িত্ব ও কর্মপরিধি নির্ধারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, চক্ষুসেবার সব উপাদানকে সমন্বিত করে এগিয়ে যেতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সমিতির কোষাধ্যক্ষ ডা. সৈয়দ মেহবুব উল কাদির বলেন, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অপটোমেট্রিস্টদের জন্য এখনও পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি হয়নি। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তারা প্রাথমিক চক্ষুসেবা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাই অপটোমেট্রিস্টদের মূলধারায় আনার পাশাপাশি তাদের নির্ধারিত কর্মপরিধি নিশ্চিত করতে একটি কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
‘চক্ষুস্বাস্থ্য বিষয়ক জাতীয় নীতি সংলাপ: বাংলাদেশে অপটোমেট্রিস্ট এবং সহযোগী চক্ষুসেবা কর্মীদের জন্য কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা বিষয়ে পরামর্শসভা’ শীর্ষক এ সংলাপের আয়োজন করে অরবিস ইন্টারন্যাশনাল। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন অরবিস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর এবং ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর দ্য প্রিভেনশন অব ব্লাইন্ডনেসের বাংলাদেশের অনারারি কান্ট্রি চেয়ার ডা. মুনির আহমেদ।
ডা. মুনির আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে চক্ষুসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে জনবলের ঘাটতি অন্যতম বড় সমস্যা। প্রয়োজনীয় জনবল তৈরি ছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘স্পেকস ২০৩০’ লক্ষ্য অর্জনও কঠিন হবে।
বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক ডা. কে জামান বলেন, দেশের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ বর্তমানে চক্ষুসেবার প্রয়োজন অনুভব করেন। কিন্তু সেই চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান ও জনবল এখনও পর্যাপ্ত নয়।
চিটাগাং আই ইনফার্মারি অ্যান্ড ট্রেনিং কমপ্লেক্সের মেডিকেল পরিচালক ডা. রাজীব হোসেন বলেন, দেশে প্রাথমিক চক্ষুসেবা নিশ্চিত করতে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা ও আইন প্রয়োজন। বর্তমানে দেশে প্রায় ২৫০ জন গ্র্যাজুয়েট অপটোমেট্রিস্ট রয়েছেন। তাদের জন্য পৃথক কাউন্সিল গঠন এবং সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুসরণ করে তাদের কর্মপরিধিও নির্ধারণ করা উচিত।
সিএসএফ গ্লোবালের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার জহুরুল ইসলাম জুয়েলও অপটোমেট্রিস্টদের স্বীকৃতি দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি অপটোমেট্রি কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব দেন।
অপটোমেট্রি কনফেডারেশন অব বাংলাদেশের সভাপতি শাহাদাত হোসেন দেলোয়ার বলেন, বিশ্বে ১২৫টি দেশে অপটোমেট্রি পেশাজীবীরা কাজ করছেন এবং ৩৪টি দেশে এ পেশার জন্য প্রতিষ্ঠিত কাউন্সিল রয়েছে। বাংলাদেশেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাউন্সিল গঠন করা হলে অপটোমেট্রি শিক্ষার মান, পেশাগত নিবন্ধন, লাইসেন্সিং এবং সেবার মান নিয়ন্ত্রণে একটি সুসংগঠিত কাঠামো তৈরি হবে।
তিনি আরও বলেন, এর মাধ্যমে অনুমোদিত পদবি ব্যবহারের নিশ্চয়তা, বিভ্রান্তিকর পেশাগত পরিচয় বন্ধ এবং মাঠপর্যায়ে অনৈতিক ও অননুমোদিত কার্যক্রম কমানো সম্ভব হবে।
সংলাপে চক্ষু চিকিৎসক, অপটোমেট্রিস্ট, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, বিভিন্ন চিকিৎসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতারা অংশ নেন। বক্তারা চক্ষুসেবার ঘাটতি পূরণ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে মানসম্মত চক্ষুসেবা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন।
আলোচনার সার্বিক দিক বিবেচনায় চক্ষুসেবা সম্প্রসারণ, অপটোমেট্রিস্টদের পেশাগত স্বীকৃতি এবং সেবার মান নিশ্চিত করতে একটি পৃথক অপটোমেট্রি কাউন্সিল গঠনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে অংশীজনদের মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
প্রতিবেদকের নাম 




















