উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে বিক্রির দাবি বেসরকারি কোম্পানিগুলোর, মূল্য সমন্বয়ের আহ্বান
হাম ও ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় দেশে তরল স্যালাইন বা আইভি স্যালাইনের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ও সরবরাহ কম থাকায় বাজারে দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। হাসপাতালের শয্যায় রোগী রেখে প্রয়োজনীয় স্যালাইন সংগ্রহ করতে এক ফার্মেসি থেকে অন্য ফার্মেসিতে ছুটতে হচ্ছে স্বজনদের।
স্যালাইন প্রস্তুতকারকদের হিসাবে, রোগীর চাপ বাড়ায় মাসিক চাহিদা ৪০-৪৫ লাখ ব্যাগ থেকে বেড়ে প্রায় ৮০-৯০ লাখ ব্যাগে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, সরকারি প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) মাসিক উৎপাদন সক্ষমতা মাত্র ৩-৪ লাখ ব্যাগ। বেসরকারি উৎপাদকদের দাবি, উৎপাদন খরচ বাড়লেও দীর্ঘদিন ধরে দাম সমন্বয় না করায় লোকসানের মুখে পড়ে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে।
ফলে প্রয়োজনের সময় স্যালাইন না পেয়ে বিপাকে পড়ছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।
প্রায় ২০ দিন ধরে সরবরাহে ঘাটতি
ফার্মেসি ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, প্রায় ২০ দিন ধরে বিভিন্ন কোম্পানি নিয়মিত স্যালাইন সরবরাহ করতে পারছে না। ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের মেডিকেয়ার ফার্মেসির কর্মী ফয়সাল আহমেদ জানান, প্রতিদিন অনেক মানুষ তরল স্যালাইন কিনতে এলেও তাঁদের ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। ওরিয়ন, পপুলার ও বেক্সিমকোসহ বিভিন্ন কোম্পানির সোডিয়াম ক্লোরাইড স্যালাইন পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সাবেক পরিচালক জাকির হোসেন রনি বলেন, বেসরকারি কোম্পানিগুলো স্যালাইনের উৎপাদন অনেক কমিয়ে দিয়েছে। তাঁর ভাষ্য, উৎপাদন খরচ বাড়লেও সরকার মূল্য সমন্বয় না করায় প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসানে উৎপাদন চালিয়ে যেতে চাইছে না। একই সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ সংকটে পড়েছে।
মালিবাগের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি রোগীর স্বজন শাকিল হোসেন জানান, মালিবাগ, মগবাজার ও ইস্কাটনের প্রায় ৩০টি ফার্মেসি ঘুরেও তিনি এক ব্যাগ স্যালাইন পাননি। পরে শাহবাগের একটি ফার্মেসি থেকে দ্বিগুণ দামে স্যালাইন কিনতে হয়েছে তাঁকে। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে প্রতি ব্যাগ স্যালাইনের দাম প্রায় ৮০ থেকে ৮৭ টাকা।
সরকারি উৎপাদন চাহিদার তুলনায় অনেক কম
আইভি স্যালাইন প্রস্তুতকারকদের হিসাবে, স্বাভাবিক সময়ে দেশে মাসে প্রায় ৪০-৪৫ লাখ ব্যাগ স্যালাইনের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৮০-৯০ লাখে পৌঁছেছে। ইডিসিএলের মাসিক উৎপাদন সক্ষমতা মাত্র ৩-৪ লাখ ব্যাগ। ফলে সরকারি উৎপাদনের মাধ্যমে জাতীয় চাহিদার সামান্য অংশই পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে।
চিকিৎসকদের মতে, গুরুতর অসুস্থতার কারণে যেসব রোগী পর্যাপ্ত পানি পান করতে পারেন না, তাঁদের পানিশূন্যতা প্রতিরোধ এবং শরীরে তরল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখতে আইভি স্যালাইন প্রয়োজন হতে পারে। তবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত সব রোগীর জন্য আইভি স্যালাইন প্রয়োজন হয় না; চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তা ব্যবহার করা উচিত।
দাম সমন্বয় না হওয়ায় উৎপাদন কমানোর দাবি
বেসরকারি উৎপাদকদের দাবি, ২০১৫ সালের পর থেকে তরল স্যালাইনের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য বাড়ানো হয়নি। অথচ কাঁচামাল আমদানি, প্যাকেজিং, ডলারের বিনিময় হার, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও শ্রমিকদের বেতনসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেড়েছে।
তাদের দাবি, সরকার নির্ধারিত ৮৭ টাকার বিপরীতে বর্তমানে প্রতি ব্যাগ স্যালাইন উৎপাদনে খরচ হচ্ছে প্রায় ১২০ টাকা। ফলে লোকসান এড়াতে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা।
ওরিয়ন ইনফিউশনের সহকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুল বাশার বলেন, স্যালাইনের মূল্য সংশোধনের প্রস্তাব প্রায় তিন মাস ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আটকে রয়েছে। আগে তাঁদের প্রতিষ্ঠান মাসে ১০ লাখ ব্যাগ স্যালাইন উৎপাদন করলেও বর্তমানে তা কমিয়ে ৪-৫ লাখ ব্যাগে নামানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আইভি স্যালাইনের পানি ছাড়া অন্যান্য উপাদানের জন্য আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও দাম ২০১৫ সালের নির্ধারিত তালিকায় থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলো চাপে রয়েছে। দেশে প্রায় ২৫০টি ওষুধ কোম্পানি থাকলেও ইনফিউশন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মাত্র ছয়টি বলে জানান তিনি।
বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ বা কম
দাম ও উৎপাদন ব্যয়ের টানাপোড়েনে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি স্যালাইন উৎপাদন বন্ধ বা কমিয়ে দিয়েছে বলে জানা গেছে। একসময় দেশের অন্যতম বৃহৎ স্যালাইন প্রস্তুতকারক লিবরা ইনফিউশনস তাদের কারখানা বন্ধ করেছে। স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস স্যালাইন উৎপাদন স্থগিত রেখেছে এবং বেক্সিমকোও কিছু উৎপাদন বন্ধ করেছে।
এ ছাড়া অপসোনিন, ওএসএল ফার্মা, এসেনশিয়াল ড্রাগস ও পপুলার ফার্মার উৎপাদন কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্যালাইন উৎপাদনে ফিরতে চায় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট
দেশে সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্যালাইন উৎপাদন হতো রাজধানীর মহাখালীর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে (আইপিএইচ)। সেখানে প্রতিদিন গড়ে আট হাজার ব্যাগ স্যালাইন উৎপাদন করা হতো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শর্ত পূরণ করতে না পারায় ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে ছয়টি আঞ্চলিক কেন্দ্রেও উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফী জানান, আগের অবকাঠামো সংস্কার করে পুনরায় তরল স্যালাইন উৎপাদন শুরু করা সম্ভব। এ জন্য ইতোমধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কারের প্রস্তাবে সম্মতি দিলে এক বছরের মধ্যে উৎপাদনে ফেরা সম্ভব হবে।
দেশে স্যালাইনের সংকট মোকাবিলায় একদিকে বেসরকারি উৎপাদকদের মূল্য সমন্বয়ের দাবি, অন্যদিকে সরকারি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ—দুই বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে চিকিৎসার প্রয়োজনে স্যালাইন সংগ্রহ করতে গিয়ে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে।
প্রতিবেদকের নাম 




















