সিলেটে তীব্র জনবল সংকটে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত কার্যত ধুঁকছে। দক্ষ জনবলের অভাবে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, এমআরআইসহ গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা সরঞ্জাম অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যাচ্ছে না। সিলেট বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডায়াগনস্টিক ও জটিল চিকিৎসার প্রায় ৫২ শতাংশ সরঞ্জাম পুরোপুরি অব্যবহৃত রয়েছে। কিছু যন্ত্র আংশিক সচল থাকলেও জনবল সংকটসহ নানা কারণে সেগুলো কাজে লাগানো হচ্ছে না।
৫০০ শয্যার হাসপাতালে রোগী ৩ হাজার
সিলেটের সর্বোচ্চ চিকিৎসাকেন্দ্র সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ৫০০ শয্যার। বর্তমানে কোনো রকমে ৭০০ শয্যার ব্যবস্থা করে রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে। অথচ প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার।
হাসপাতালে কোটি টাকার আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকলেও সবগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। রেডিওলজি বিভাগে থাকা সিটি স্ক্যান ও এমআরআই মেশিনে প্রায়ই যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। বিকল্প বা ব্যাকআপ ব্যবস্থা না থাকায় এসব যন্ত্র নষ্ট হলে ঢাকা থেকে প্রকৌশলী বা সংশ্লিষ্ট লোকজন এনে মেরামত করতে হয়। এতে সময়ক্ষেপণের পাশাপাশি রোগীদের দুর্ভোগও বাড়ে।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মুনির বলেন, যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়া ও মেরামত হওয়া একটি চলমান প্রক্রিয়া। তবে ৫২ বছর আগের ৫০০ শয্যার হাসপাতালের জনবল দিয়েই বর্তমানে ৩ হাজারের বেশি রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, রোগী এলে ফেরত পাঠানোর সুযোগ নেই। ফলে সীমিত জনবল দিয়ে সবাইকে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে। প্রতিরাতে ভর্তি রোগীসহ অন্তত ৭ হাজার মানুষ হাসপাতালে অবস্থান করেন। এত মানুষের চাপ সামলাতে গিয়ে কর্মরতদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে।
তারপরও হাসপাতালটি সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে জানান পরিচালক। এরই মধ্যে শিশু হৃদরোগীদের জটিল অস্ত্রোপচারসহ অন্যান্য রোগীদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তবে জনবল সংকটসহ নানা কারণে এসব অর্জন অনেক সময় দৃশ্যমান হচ্ছে না।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও যন্ত্র আছে, নেই চালানোর লোক
সিলেট বিভাগের চার জেলার ৪০টি উপজেলায় ৩৬টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলা সদরে ২৫০ শয্যার সরকারি হাসপাতাল রয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে এক্স-রে মেশিন, ইসিজি, এনালাইজার ও আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম রয়েছে। কিন্তু এসব যন্ত্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় অনেক মেশিনই অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।
শুধু উপজেলা পর্যায়েই নয়, খোদ বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয়েও রয়েছে জনবল সংকট। একজন বিভাগীয় পরিচালক ও মাত্র একজন সহকারী পরিচালককে চার জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে।
৮ হাজার ৪১১ পদের বিপরীতে কর্মরত ৪ হাজার ৮৫৫
সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন গ্রেডে মঞ্জুরিকৃত পদের সংখ্যা ৮ হাজার ৪১১টি। এর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ৪ হাজার ৮৫৫ জন। অর্থাৎ শূন্য রয়েছে ৩ হাজার ৫৫৬টি পদ।
জনবল সংকটের সবচেয়ে খারাপ চিত্র দেখা যাচ্ছে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট পদে। বিভাগের মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) পদের সংখ্যা ১১৭টি। এর মধ্যে ৭১টি পদই শূন্য।
সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী পরিচালক ডা. নূরে আলম শামীম বলেন, বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। শিগগিরই সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, হবিগঞ্জ জেলায় স্বাস্থ্য সহকারী পদে কিছু নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে উপজেলা কমপ্লেক্সগুলোতে সনোলজি মেশিন থাকলেও সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় পদ নেই। ফলে রোগীরা এই সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে আরও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রয়োজন রয়েছে।
জনবল ছাড়া আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামও অকার্যকর
স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার পাশাপাশি সেগুলো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা জরুরি। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকলে আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও তার সুফল রোগীরা পাবেন না।
তাদের মতে, স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতকে কার্যকর রাখতে দ্রুত শূন্য পদ পূরণ, প্রয়োজনীয় টেকনোলজিস্ট নিয়োগ এবং উপজেলা পর্যায়ে যন্ত্র পরিচালনার জন্য উপযুক্ত পদ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। তা না হলে সরকারি অর্থে কেনা মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম অব্যবহৃত থেকে যাওয়ার পাশাপাশি রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবাও ব্যাহত হবে।
প্রতিবেদকের নাম 




















