ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের রোড ম্যাপ ঘোষণার পর দেশজুড়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা বেড়েছে। আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে ২৭ মে পঞ্চম ধাপের মধ্য দিয়ে নির্বাচন শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। নির্দলীয় এই নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীরা মাঠে সক্রিয় হয়েছেন। তবে প্রতিটি ইউনিয়নে একাধিক নেতা বিএনপির সমর্থন চাইছেন। ফলে দলটির জন্য একক প্রার্থী নির্ধারণ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ১২ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন ঘোষিত রোড ম্যাপ অনুযায়ী, পাঁচ ধাপে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম ধাপে ২১ জানুয়ারি, দ্বিতীয় ধাপে ৪ ফেব্রুয়ারি, তৃতীয় ধাপে ২৯ এপ্রিল, চতুর্থ ধাপে ১৩ মে এবং পঞ্চম ধাপে ২৭ মে ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, স্থানীয়ভাবে ভোটের তপশিল ঘোষণা করা হবে। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা ভোটের কমপক্ষে ছয় সপ্তাহ আগে তপশিল প্রকাশ করবেন।
রোড ম্যাপ ঘোষণার আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেন। ঘোষণার পর জনসংযোগ আরও জোরদার হয়েছে। হাটবাজার, মসজিদ, পাড়া-মহল্লা ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্থানীয়দের সমর্থন চাইছেন অনেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার চালাচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা।
নির্বাচন নির্দলীয় হলেও বিএনপির সমর্থন পেতে তৃণমূলের নেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র। কোনো কোনো সম্ভাব্য প্রার্থী কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, আবার কেউ এলাকার সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের কাছে গিয়ে নিজের পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন। অতীতের রাজনৈতিক আন্দোলনে ভূমিকা, মামলা, কারাবাস ও হামলার শিকার হওয়ার তথ্য-প্রমাণও তুলে ধরছেন অনেকে।
বিএনপির সামনে বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে অভ্যন্তরীণ বিরোধের আশঙ্কা। প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে দলটির চার থেকে আটজন পর্যন্ত নেতা সমর্থন চাইছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একাধিক প্রার্থী মাঠে সক্রিয় থাকায় শেষ পর্যন্ত সবাইকে একজনের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করা কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতারা।
গত ১১ অক্টোবর সংসদ ভবনে বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় দলীয় ঐক্য বজায় রাখা এবং একক প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার বিষয়ে সংসদ সদস্যদের নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নির্বাচনে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ না করার ব্যাপারেও সতর্ক করেন তিনি। নির্দেশনা অমান্য করলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও জানান।
তবে বিএনপির নেতাদের ভাষ্য, প্রার্থী বাছাই ও নির্বাচনি কৌশল নিয়ে কেন্দ্র থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। স্থানীয় পর্যায়েও একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীর মধ্য থেকে একজনকে বেছে নেওয়ার সাংগঠনিক প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে কেউ প্রার্থী হলে বহিষ্কারসহ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। নির্বাচনের আগে সমঝোতা না হলে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ বাড়ার পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক শক্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নেতারা।
দলীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু না হলেও গ্রহণযোগ্য ও তুলনামূলকভাবে বিতর্কমুক্ত প্রার্থী বাছাইয়ে বিএনপি গোপনে তথ্য সংগ্রহ করছে। দলের বিভিন্ন শাখা ও অন্যান্য মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন দলীয় প্রধানের কাছে উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে।
ইউপি নির্বাচন সামনে রেখে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের ১২টি জেলা ও মহানগর কমিটির সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন তারেক রহমান। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থিতার বিষয়ে এখনো সাংগঠনিক নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে জেলা ও মহানগর নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ে দলীয় ঐক্য এবং একক প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থীরাও আগে থেকেই মাঠে সক্রিয়। অনেক ইউনিয়নে জামায়াতের একক চেয়ারম্যান প্রার্থী মোটামুটি নির্ধারিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এনসিপিসহ অন্য দলগুলোও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি নিজ দলের একাধিক প্রার্থীকে সামলানোর চ্যালেঞ্জেও পড়তে পারে বিএনপি।
আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়েও আলোচনা
নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়েও বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা চলছে। স্থানীয় নেতাদের আশঙ্কা, আত্মগোপনে থাকা বা পলাতক আওয়ামী লীগের কিছু নেতা-কর্মী তপশিল ঘোষণার পর প্রার্থী ঠিক করে নির্বাচনি তৎপরতা শুরু করতে পারেন। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে কীভাবে তা মোকাবিলা করা হবে, সে বিষয়ে কেন্দ্র থেকে এখনো কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
২০৩ আসনের এমপিদের জন্য ৫১ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ
ইউপি নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার বিভাগের মাধ্যমে ২০৩টি আসনের সংসদ সদস্যদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। মন্ত্রীর অভিপ্রায়ে এসব আসনের এমপিরা নিজেদের পছন্দের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারবেন। বরাদ্দের মোট পরিমাণ ৫১ কোটি ১৮ লাখ টাকা, যা আগামী বছরের ৩০ জুনের মধ্যে ব্যয় করতে হবে। ইউপি নির্বাচন জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন—এমন আসনের ইউনিয়নগুলো এই বরাদ্দের আওতায় আসেনি। তবে বিরোধী জোট ছেড়ে যাওয়া খেলাফত মজলিসের সংসদ সদস্যের সিলেট-৫ আসনের ইউনিয়নগুলো বরাদ্দ পেয়েছে। জামায়াতে ইসলামী অভিযোগ করেছে, সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের পছন্দের প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ করে দিতেই নির্বাচনের আগে এই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা ভোটের পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।
সব মিলিয়ে, পাঁচ ধাপের ইউপি নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা বাড়ছে। তবে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে পারে অভ্যন্তরীণ কোন্দল সামলে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর প্রস্তুতি, আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ এবং বিশেষ বরাদ্দ ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও নির্বাচনি পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক
প্রতিবেদকের নাম 



















