লিওনেল মেসির অবিশ্বাস্য ফুটবল ক্যারিয়ারের পেছনে রয়েছে পরিবারের ত্যাগ, সংগ্রাম ও অটুট সমর্থনের দীর্ঘ ইতিহাস। আর এই যাত্রায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা মানুষদের একজন তার বাবা হোর্হে মেসি। ছেলের চিকিৎসার খরচ জোগাড় থেকে শুরু করে ইউরোপে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত—মেসির জীবনের বড় মোড়গুলোতে বাবার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৫৮ সালের ১ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া হোর্হে মেসি জীবনের বড় একটি সময় ইস্পাত কারখানায় কাজ করেছেন। স্ত্রী সেলিয়া কুকচিতিনির সঙ্গে তার সংসারে চার সন্তান—লিওনেল, রদ্রিগো, মাটিয়াস ও মারিয়া সোল।
ছোটবেলা থেকেই লিওনেলের ফুটবল প্রতিভা নজর কেড়েছিল। কিন্তু তার গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি ধরা পড়ার পর পরিবারকে বড় ধরনের আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে হোর্হে মেসিকে কঠোর সংগ্রাম করতে হয়েছিল।
এক সাক্ষাৎকারে হোর্হে জানান, তিনি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন, সেখানকার ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তাদের সহায়তায় প্রথম দুই বছর চিকিৎসার খরচ চালানো সম্ভব হলেও পরে সেই সহায়তা আর অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়নি।
এমন পরিস্থিতিতে মেসির জীবনে আসে বার্সেলোনার সুযোগ। তখন লিওনেলের বয়স মাত্র ১৩ বছর। ছেলের চিকিৎসার খরচ বহনের বিষয়ে বার্সেলোনার সঙ্গে আলোচনা করেন হোর্হে। শেষ পর্যন্ত ছেলেকে নিয়ে আর্জেন্টিনার রোজারিও ছেড়ে স্পেনে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
পরিবারের জন্য এটি ছিল বড় ঝুঁকি। পরিচিত পরিবেশ, আত্মীয়স্বজন ও জন্মভূমি ছেড়ে অচেনা দেশে নতুন জীবন শুরু করতে হয়েছিল তাদের। তবে সেই সিদ্ধান্তই পরবর্তী সময়ে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা অধ্যায়ের ভিত্তি তৈরি করে।
মেসির ক্যারিয়ার যত এগিয়েছে, তার বাবা হোর্হের ভূমিকাও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। বার্সেলোনার সঙ্গে চুক্তি নবায়ন, ব্যবসায়িক বিষয়, স্পনসরশিপসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি ছেলের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। তার মূল লক্ষ্য ছিল, লিওনেল যেন মাঠের খেলায় মনোযোগ দিতে পারেন এবং বাইরের বিষয়গুলো পরিবার ও বিশ্বস্ত সহযোগীরা সামলাতে পারেন।
২০২১ সালে বার্সেলোনার সঙ্গে সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে মেসির পিএসজিতে যোগ দেওয়ার সময়ও হোর্হে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। পরে ২০২৩ সালে ইন্টার মিয়ামিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তবে কোটি ডলারের চুক্তি কিংবা বড় ক্লাবের আলোচনার বাইরে হোর্হে মেসির সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি লিওনেল মেসির বাবা। দীর্ঘ কর্মজীবনে কঠোর পরিশ্রম করে সন্তানদের বড় করা, ছেলের চিকিৎসার জন্য সংগ্রাম করা এবং শেষ পর্যন্ত তার স্বপ্নের পেছনে দাঁড়ানো—সবকিছুর মধ্যেই ফুটে ওঠে সেই সম্পর্কের গভীরতা।
মেসিও বিভিন্ন সময়ে বাবার ত্যাগের কথা স্মরণ করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ছোটবেলায় হোর্হে ভোরে কাজে বেরিয়ে যেতেন এবং রাতে বাড়ি ফিরতেন। বাবার সঙ্গে বেশি সময় কাটানোর সুযোগ না পেলেও তার পরিশ্রম ও ব্যক্তিত্ব মেসির মনে গভীর ছাপ ফেলেছে।
রোজারিওর কঠিন দিন থেকে বার্সেলোনার একাডেমি, এরপর বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়—মেসির এই দীর্ঘ যাত্রায় হোর্হে ছিলেন বাবা, অভিভাবক, প্রতিনিধি ও পরামর্শক। আর ১৩ বছর বয়সে ছেলেকে নিয়ে স্পেনে পাড়ি জমানোর সেই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত বদলে দেয় শুধু একটি পরিবারের ভাগ্য নয়, ফুটবল ইতিহাসের গতিপথও।
প্রতিবেদকের নাম 




















