সমন্বিত গণপরিবহন গড়ে তুলতে নতুন স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি) ২০২৬–২০৪৫ প্রণয়ন করছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। পরিকল্পনায় রাজধানীতে ৮টি মেট্রোরেল, ৬টি এক্সপ্রেসওয়ে, ৩টি রিং রোড এবং ২১টি মাল্টিমোডাল পরিবহন হাব নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ডিটিসিএ ভবনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় ‘স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি) ২০২৬–২০৪৫’-এর বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। সভায় বৃহত্তর ঢাকার দীর্ঘমেয়াদি পরিবহন পরিকল্পনা, চলমান প্রকল্প এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৪৫ সালের মধ্যে রাজধানীর মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক ২৬৮ দশমিক ৫ কিলোমিটারে উন্নীত করা হবে। বর্তমানে ১৯ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নেটওয়ার্ক ২০৩০ সালে ৭২ দশমিক ২ কিলোমিটার, ২০৩৫ সালে ১৩৭ দশমিক ৮ কিলোমিটার এবং ২০৪৫ সালে ২৬৮ দশমিক ৫ কিলোমিটারে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ডিটিসিএর প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনায় রয়েছে ৮টি মেট্রোরেল (এমআরটি) লাইন, ২টি বিআরটি লাইন, ৩টি রিং রোড, ৮টি রেডিয়াল সড়ক, ৬টি এক্সপ্রেসওয়ে এবং ২১টি মাল্টিমোডাল পরিবহন হাব নির্মাণ।
সভায় জানানো হয়, রাজধানীতে গণপরিবহনের ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। ২০১৪ সালে দৈনন্দিন যাতায়াতে গণপরিবহনের অংশ ছিল ২২ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে নেমে এসেছে মাত্র ৮ দশমিক ৯ শতাংশে। একই সময়ে ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও তিন চাকার যানবাহনের ব্যবহার বেড়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযোগ জোরদার করতে প্রায় ৭৯ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পাঁচটি মনোরেল করিডরেরও প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রকল্পের প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)কে দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যানজট নিরসনে রাজধানীর চারপাশে তিনটি রিং রোড নির্মাণের পাশাপাশি সদরঘাট থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত একটি বৃত্তাকার নৌপথ এবং একাধিক ল্যান্ডিং স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
ডিটিসিএ জানিয়েছে, আন্তজেলা বাস টার্মিনালগুলো ধাপে ধাপে নগরের বাইরে স্থানান্তরের কাজ চলছে। একই সঙ্গে বাস রুট রেশনালাইজেশন ও কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার উদ্যোগও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে বিআরটিএ অনুমোদিত ৪১৮টি বাস রুটের মধ্যে সচল রয়েছে মাত্র ৯৮টি। এ কারণে ৩২টি প্রধান রুট ও ২৫টি ফিডার রুট নিয়ে নতুন বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সভায় ‘র্যাপিড পাস’ স্মার্ট কার্ডের অগ্রগতিও তুলে ধরা হয়। বর্তমানে ১৯ লাখ ৩৭ হাজারের বেশি যাত্রী এই কার্ড ব্যবহার করছেন এবং শুধু মেট্রোরেলেই প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৭০ লাখ যাত্রা সম্পন্ন হচ্ছে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্টের আওতায় রাজধানীতে ৪০০টি বৈদ্যুতিক বাস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩১ সালের আগস্টের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
গাবতলী, কমলাপুর ও বিমানবন্দর এলাকায় মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব হাবে মেট্রোরেল, বাস, রেল, নৌ ও বিমান পরিবহনকে একীভূত করে যাত্রীদের নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করা হবে।
আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) বিজন কান্তি সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক, সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ, ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান।
উল্লেখ্য, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জ ও মানিকগঞ্জকে নিয়ে গঠিত বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চলের সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও তদারকির দায়িত্ব পালন করছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)।
প্রতিবেদকের নাম 



















