২০ কোটি টাকা খরচ করে এশিয়ান গেমসে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের অর্জন মাত্র একটি পদক—তাও ব্রোঞ্জ। জাপানে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমস ঘিরে তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিনিময়ে দেশের ক্রীড়াঙ্গন আসলে কী পেল?
এবার এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের জন্য প্রথমে ৩৭ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছিল। পরে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ তা কমিয়ে প্রায় ২০ কোটি টাকা নির্ধারণ করে। দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই অর্থও কম নয়। কিন্তু বিপুল ব্যয়ের বিপরীতে সোনা কিংবা রুপা তো দূরের কথা, এসেছে মাত্র একটি ব্রোঞ্জ পদক।
২২ ডিসিপ্লিনে অংশগ্রহণ, পদক মাত্র একটি
জাপান এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ ব্যক্তিগত ও দলীয় মিলিয়ে ২২টি ডিসিপ্লিনে অংশ নেয়। শেষ পর্যন্ত উশু থেকে একটি ব্রোঞ্জ পদক পান জিন্নাত আক্তার।
তবে পদকটি এসেছে অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে। উশুর নিয়ম অনুযায়ী সেমিফাইনালে উঠলেই পদক নিশ্চিত হয়। কোয়ার্টার ফাইনালে জিন্নাতের প্রতিপক্ষ অংশ না নেওয়ায় তিনি সরাসরি সেমিফাইনালে চলে যান। সেখানে অবশ্য ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে জয় পাননি। ফলে সেমিফাইনালে না জিতেও নিশ্চিত হয় ব্রোঞ্জ পদক।
এমন পরিস্থিতিতে ২০ কোটি টাকা ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
যাদের ঘিরে ছিল প্রত্যাশা, তারাও ব্যর্থ
গেমস শুরুর আগে বাংলাদেশের কয়েকটি ইভেন্ট নিয়ে আশাবাদ ছিল। পুরুষ ও নারী ক্রিকেট, পুরুষ ও নারী কাবাডি, আর্চারি, শুটিং ও সাঁতারে ভালো করার প্রত্যাশা ছিল।
কিন্তু প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যায়নি। পুরুষ ক্রিকেট দলকে ঘিরে পদকের আশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা পূরণ হয়নি। নারী ক্রিকেটেও সাফল্য আসেনি।
কাবাডি একসময় এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের অন্যতম শক্তিশালী ইভেন্ট ছিল। পুরুষ দল এক দিনে দুটি ম্যাচ জিতে আশার সঞ্চার করলেও শেষ পর্যন্ত পদকের কাছাকাছি যেতে পারেনি। নারী দলও প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
আর্চারি নিয়েও দেশে দীর্ঘদিন ধরে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এশিয়ান গেমসে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যায়নি। শুটিং, সাঁতার ও অ্যাথলেটিক্সসহ অন্যান্য ইভেন্টেও সাফল্য অধরাই থেকেছে।
এতগুলো ইভেন্টে অংশ নেওয়ার প্রয়োজন কতটা?
যদি সম্ভাবনা সীমিত থাকে, তাহলে এতগুলো ইভেন্টে অংশ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অবশ্য আন্তর্জাতিক আসরে অংশগ্রহণের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের অভিজ্ঞতা বাড়ে—এটি সত্য। কিন্তু সীমিত অর্থের দেশে কোন ইভেন্টে বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে সাফল্যের সম্ভাবনা বেশি, সেই অগ্রাধিকার নির্ধারণও জরুরি।
ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো প্রায়ই অর্থসংকটের কথা বলে। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, প্রস্তুতি ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য অর্থের অভাবের কথাও শোনা যায়। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সীমিত বাজেটের কারণে অনেক পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।
অথচ বড় আন্তর্জাতিক গেমস এলেই বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রবণতা দেখা যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, সেই অর্থের বড় অংশ যদি খেলোয়াড়দের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করা হতো, তাহলে ফল কি ভিন্ন হতে পারত?
২৬০ জনের বহর নিয়েও প্রশ্ন
এবার জাপানে বাংলাদেশের বহরে ছিলেন প্রায় ২৬০ জন। এর মধ্যে ক্রীড়াবিদদের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মকর্তা ছিলেন।
এত বড় বহর পাঠানোর যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এমন অভিযোগও সামনে এসেছে যে, কর্মকর্তাদের কেউ কেউ কোচের পরিচয় ব্যবহার করে দলে গেছেন। অভিযোগটি সত্য হলে তা অবশ্যই তদন্তের দাবি রাখে।
কারণ, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশের প্রতিনিধিত্বকারী দলের প্রতিটি সদস্যের ভূমিকা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। ক্রীড়াবিদদের প্রয়োজনের তুলনায় কর্মকর্তা সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি হলে সেটি শুধু ব্যয় বাড়ায় না, পুরো ব্যবস্থাপনাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে।
দায় এড়াতে পারে না অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন
বড় আন্তর্জাতিক গেমসে বাংলাদেশের দল নির্বাচন ও বহর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি দলের আকার ও ব্যবস্থাপনার দায়ও তাদের নিতে হবে।
সরকার যখন বারবার সরকারি অর্থের অপচয় বন্ধের কথা বলছে, তখন আন্তর্জাতিক গেমসে অপ্রয়োজনীয় বড় বহর পাঠানো হলে তার জবাবদিহি থাকা উচিত।
শুধু কতজন খেলোয়াড় ভালো করলেন বা কতটি পদক এলো—এতে বিষয়টি শেষ হয় না। কত টাকা খরচ হলো, কোন খাতে ব্যয় হলো, দলের সঙ্গে কারা গেলেন এবং প্রত্যেকের প্রয়োজনীয়তা কী ছিল—এসব প্রশ্নেরও স্বচ্ছ উত্তর দরকার।
ক্রীড়াঙ্গনে জবাবদিহির প্রয়োজন
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে বিভিন্ন ফেডারেশনের নির্বাচন, ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক অনিয়ম নিয়ে নিয়মিত প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের কার্যক্রমও একইভাবে স্বচ্ছতার আওতায় আসা প্রয়োজন।
বিওএর বর্তমান কমিটি কীভাবে গঠিত হয়েছে, নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ ছিল এবং সংগঠনটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি কতটা রয়েছে—এসব বিষয় নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন।
ক্রীড়াঙ্গনে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার—আন্তর্জাতিক গেমস কোনো ভ্রমণ বা পিকনিকের আয়োজন নয়। এটি দেশের ক্রীড়াবিদদের নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের বড় মঞ্চ। সেখানে সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রতিটি টাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও ক্রীড়া কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
২০ কোটি টাকা খরচ করে যদি শেষ পর্যন্ত অর্জন হয় মাত্র একটি ব্রোঞ্জ পদক, তাহলে শুধু খেলোয়াড়দের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে লাভ নেই। পুরো পরিকল্পনা, প্রস্তুতি, দল নির্বাচন, কর্মকর্তা ব্যবস্থাপনা এবং অর্থ ব্যয়ের কাঠামো—সবকিছু নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার।
নইলে আন্তর্জাতিক আসর আসবে, বড় বহর যাবে, বিপুল অর্থ ব্যয় হবে; কিন্তু পদকের সংখ্যা বাড়বে না। বরং আশঙ্কা থেকেই যাবে—সাফল্যের চেয়ে ব্যক্তিগত সুবিধাই কি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে?
প্রতিবেদকের নাম 


























