
সারের ঘাটতি নেই, সংকট বিতরণব্যবস্থায়
দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই। বরং আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সম্ভাব্য চাহিদার তুলনায় সরকারের গুদামে প্রায় ১৬ লাখ ৬৩ হাজার টন বেশি সার মজুত রয়েছে। এরপরও আমন মৌসুমে মাঠপর্যায়ে চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না অনেক কৃষক। কোথাও দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, আবার কোথাও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে।
গুদামে পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও কৃষকের হাতে প্রয়োজনীয় সময়ে সার না পৌঁছানোয় প্রশ্ন উঠেছে দেশের সার বিতরণব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান সংকট মূলত সারের মজুতের নয়; বরং সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থার নানা জটিলতার ফল।
চাহিদার তুলনায় মজুত বেশি
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে সারের সম্ভাব্য চাহিদা ৩৫ লাখ ২০ হাজার টন। এর বিপরীতে সরকারি মজুত রয়েছে ৫১ লাখ ৮৩ হাজার টন। অর্থাৎ সম্ভাব্য চাহিদার তুলনায় সরকারের হাতে প্রায় ১৬ লাখ ৬৩ হাজার টন বেশি সার রয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। কুড়িগ্রাম, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলায় কৃষকেরা ডিলারের গুদামে গিয়েও প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে ফিরে আসছেন। কোথাও আবার সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় কয়েকটি এলাকায় কৃষকদের বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আমন মৌসুমে সারের চাহিদা বাড়ার সময়েই ডিলার ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ শুরু হওয়ায় সরবরাহব্যবস্থায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।
নতুন ডিলার নীতিতে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা
কৃষি মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ‘সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণসংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা ২০২৬’ গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি ইউনিয়নে সর্বোচ্চ তিনটি ডিলার ইউনিট রাখা যাবে। যোগ্য পুরোনো ডিলারদের বহাল রাখার পাশাপাশি আরও একজন নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে। একই ব্যক্তি একটির বেশি ডিলারশিপ রাখতে পারবেন না।
এ ছাড়া বর্তমানে যেসব ডিলার পয়েন্ট খালি রয়েছে, সেখানেও নতুন করে নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে সমস্যাটি হলো, এই পরিবর্তন আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এমন সময়ে, যখন মাঠে আমন আবাদ পুরোদমে চলছিল এবং কৃষকদের সারের চাহিদাও ছিল বেশি। সামনে আবার শুরু হবে রবি মৌসুম।
কর্মকর্তারা জানান, ডিলার ব্যবস্থা সংশোধনের কাজ জুনে শুরু হলেও নীতিমালায় বারবার পরিবর্তন আসায় নিয়োগ প্রক্রিয়া সারের সর্বোচ্চ চাহিদার সময় পর্যন্ত গড়ায়। এর ফলে মাঠপর্যায়ে সরবরাহব্যবস্থা আরও চাপের মুখে পড়ে।
গুদাম থেকে সার তোলায় অনীহা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) একাধিক কর্মকর্তা জানান, আমন মৌসুমের আবাদ আগস্টের শুরু থেকেই শুরু হয়। এ সময় কৃষকদের বিপুল পরিমাণ সার প্রয়োজন হয়। কিন্তু একই সময়ে নতুন ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় পুরোনো ডিলারদের অনেকে সরকারি গুদাম থেকে সার তোলার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ আবার একেবারেই সার উত্তোলন করছেন না।
জুলাই ও আগস্টে ডিলাররা সরকারি গুদাম থেকে বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক সার উত্তোলন করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এর মধ্যে কিছু ডিলার কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে বরাদ্দের সার উত্তোলন করেননি—এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে।
গত ৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, আগের সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া ডিলারদের অনেকে দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ায় প্রায় ৩ হাজার ৭৫৯টি ডিলার পয়েন্ট খালি হয়েছে। এসব শূন্যস্থান পূরণ এবং ডিলার নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে সরকার প্রায় ৪ হাজার ৯১৮ জন নতুন ডিলার নিয়োগের পরিকল্পনা করছে।
চাহিদার সময়েই বিতরণব্যবস্থায় পরিবর্তন
কৃষিবিদদের মতে, ডিলার পয়েন্টের শূন্যতা নতুন নীতিমালার কারণে তৈরি হয়নি। তবে সারের চাহিদা যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে, ঠিক তখনই বিতরণব্যবস্থায় পরিবর্তন শুরু হওয়ায় আগে থেকেই দুর্বল ডিলার নেটওয়ার্ক আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
ফলে গুদামে সার থাকলেও শেষ ধাপে কৃষকের কাছে তা পৌঁছাতে বাধা তৈরি হচ্ছে। এর সুযোগ নিয়ে কোনো কোনো ডিলার বা অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অনিয়ম ঠেকাতে অভিযান
সার বিতরণ স্বাভাবিক রাখতে তদারকি ও অভিযান জোরদার করেছে সরকার। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, গত ২৮ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৩০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে।
এসব অভিযানে মোট ৩৮ লাখ ৬৮ হাজার ৮২৪ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি উদ্ধার করা হয়েছে ১ হাজার ৭০০ বস্তা সার এবং চারজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
কৃত্রিম সংকট বরদাশত নয়
এদিকে কৃষক পর্যায়ে সার সরবরাহে অনিয়ম, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি কিংবা অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ)।
বিএফএ চেয়ারম্যান মো. মোশারফ হোসেন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকা সত্ত্বেও অসাধু ও অসংগঠিত ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। উত্তরাঞ
প্রতিবেদকের নাম 




















