দীর্ঘদিন ধরে ফ্ল্যাট ও প্লট ক্রেতাদের ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দেওয়া এবং প্রতারণার অভিযোগে আবাসন প্রতিষ্ঠান ডোম-ইনো লিমিটেডে অস্থায়ী লিকুইডেটর বা অবসায়ক নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
রাজধানীর শান্তিনগরের ‘ডোম-ইনো প্রমেসা’ প্রকল্পের ৭৩ জন ভুক্তভোগী ফ্ল্যাট ক্রেতার আবেদনের পর দীর্ঘ শুনানি শেষে গত ৯ আগস্ট বিচারপতি সিকদার মাহমুদুর রাজির বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
১০ বছরেও মেলেনি ফ্ল্যাট
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক ক্রেতা প্রায় পুরো টাকা পরিশোধের পরও ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে ফ্ল্যাট পাননি।
আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. নজরুল ইসলাম খানের ভাষ্য অনুযায়ী, ডোম-ইনোর বিভিন্ন প্রকল্পে কোথাও শুধু ভবনের কাঠামো তৈরি হয়েছে, আবার কোথাও নির্মাণকাজই শুরু হয়নি। অথচ অনেক ক্রেতা চুক্তি অনুযায়ী প্রায় পুরো অর্থ পরিশোধ করেছেন।
অবসায়ক কী করবেন
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, নিযুক্ত অস্থায়ী অবসায়ক আপাতত ‘ডোম-ইনো প্রমেসা’ প্রকল্পের সার্বিক দায়িত্বে থাকবেন।
সাধারণভাবে লিকুইডেটরের দায়িত্ব হলো কোনো কোম্পানির সম্পদ ও দায়-দেনা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আইন অনুযায়ী পাওনাদারদের পাওনা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর মতে, অবসায়ক দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পের প্লট মালিক ও ফ্ল্যাট ক্রেতাদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
আদালত আরও বলেছেন, ডোম-ইনোর অন্যান্য প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্ত প্লট মালিক ও ফ্ল্যাট ক্রেতারাও আদালতের শরণাপন্ন হলে তাদের আবেদন বিবেচনা করা হবে।
১০-২০ বছর ধরে ঝুলে আছে প্রকল্প
ভুক্তভোগীদের পক্ষের আইনজীবী জানান, ডোম-ইনোর বিভিন্ন প্রকল্পে এমনও অভিযোগ রয়েছে যেখানে চুক্তির ১০ থেকে ২০ বছর পরও ভবন নির্মাণ শেষ হয়নি। অনেক জমির মালিক নিজেদের বাড়ি ভেঙে জমি ডেভেলপারের হাতে তুলে দেওয়ার পর বছরের পর বছর ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন।
শান্তিনগরের ‘ডোম-ইনো প্রমেসা’ প্রকল্পে তিনটি ভবনে মোট ১৩৬টি ফ্ল্যাট নির্মাণের কথা ছিল। দুটি ভবনের নির্মাণকাজ হলেও সেগুলোরও বিভিন্ন কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রকল্পের কাজ নিজেরা শেষ করতে না পারেন—এমন পরিস্থিতিও তৈরি করা হয়েছে। এমনকি বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কারণে সেখানে বসবাসকারী কয়েকটি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগে রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বাড়তি টাকা চাওয়ার অভিযোগ
ফ্ল্যাট ক্রেতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করার অভিযোগও রয়েছে ডোম-ইনোর বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের পক্ষের আইনজীবীর দেওয়া উদাহরণ অনুযায়ী, একজন ক্রেতা ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা মূল্যের ফ্ল্যাট বুকিং দিয়ে ৮০ লাখ টাকা পরিশোধ করেছিলেন। পরে তাকে আরও ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা পরিশোধের জন্য চিঠি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ডোম-ইনোর বিরুদ্ধে বহু মামলা
আইনজীবীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডোম-ইনোর মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১৩৬টি মামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি মামলায় তার চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ডও হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া দুটি আরবিট্রেশন মামলায় ১৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা করে জরিমানার তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। শতাধিক মামলার মধ্যে অন্তত ১৭টিতে গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
গত ১১ আগস্টও একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালতের আদেশকে মাইলফলক বলছেন আইনজীবী
ভুক্তভোগীদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. নজরুল ইসলাম খান হাইকোর্টের এই আদেশকে বাংলাদেশের আবাসন খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তার দাবি, এই আদেশের ফলে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করা আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হলো। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী অস্থায়ী অবসায়ক দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রতিবেদকের নাম 



















