দেশে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক ও অনুরূপ বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান চলাচল করছে। এসব যান দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ বা তারও বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে বলে সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
অন্যদিকে, বৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা মাত্র ৩ হাজার ৩০০টি। সরকারের ধারণা, শুধু ঢাকাতেই ৪৮ হাজারের বেশি অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে। এসব অবৈধ সংযোগের কারণে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বাড়ছে চাপ
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সংসদে কার্যপ্রণালি-বিধির ৭১ বিধিতে বিএনপির সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য রেহানা আক্তার রানুর আনা জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের জবাবে এসব তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
মন্ত্রী বলেন, গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইকসহ বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান নগর ও গ্রামীণ পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। কম ভাড়া ও সহজলভ্যতার কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলে এসব যান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের ফলে বিপুলসংখ্যক যান একসঙ্গে চার্জ দেওয়ায় স্থানীয় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। অনুমোদিত বা আবাসিক সংযোগের বাণিজ্যিক ব্যবহার, ট্রান্সফরমার ও বিতরণ লাইনে বাড়তি লোড এবং পিক সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির মতো সমস্যাও দেখা দিচ্ছে।
বছরে ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতির দাবি
সরকারের হিসাবে, অবৈধ চার্জিং পয়েন্টে বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।
রেহানা আক্তার রানু তার নোটিশে বলেন, অটোরিকশা সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য বাহন হলেও এসব যানকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা প্রয়োজন। তিনি অটোরিকশায় নম্বর প্লেট সংযোজন, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সের আওতায় আনা এবং প্রধান সড়ক থেকে এসব যান সরিয়ে অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচলের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন।
সড়ক দুর্ঘটনায় অটোরিকশার অংশ ১৩.৫৪ শতাংশ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা চলাচল যানজটের পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।
তার দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯১১ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ৮১২ জন আহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় যুক্ত যানবাহনের মধ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অংশ ছিল ১৩.৫৪ শতাংশ।
অনিবন্ধিত যান, অপ্রশিক্ষিত চালক, ত্রুটিপূর্ণ নকশা, ব্রেক ও আলো ব্যবস্থার ত্রুটি, অতিরিক্ত গতি এবং মহাসড়কে স্বল্পগতির যান চলাচলকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ানোর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
ব্যাটারির সিসাদূষণ নিয়েও উদ্বেগ
অটোরিকশায় ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির অনিরাপদ ব্যবস্থাপনা ও অনানুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের কারণে সিসাদূষণ, মাটি ও পানিদূষণ বাড়ছে। এতে বিশেষ করে শিশু শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষি ও পোল্ট্রি শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ঢাকায় বাড়ছে এআই ক্যামেরার ব্যবহার
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে বর্তমানে ৫০টি এআইভিত্তিক ক্যামেরা চালু রয়েছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে অটোরিকশাসহ অন্যান্য যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে।
এর ধারাবাহিকতায় রমনা ও তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগে আরও ২০০টি এআইভিত্তিক ক্যামেরা স্থাপনের কার্যক্রম চলছে। পর্যায়ক্রমে ঢাকা মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়গুলোতেও এসব ক্যামেরা স্থাপন করা হবে।
অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে আসছে নীতিমালা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, অটোরিকশাকে সুশৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার আওতায় আনতে সরকার নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে।
নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে অনুমোদিত অটোরিকশাকে নম্বর প্লেট ও কিউআর কোডের মাধ্যমে শনাক্ত করা হবে। চালকদের নিবন্ধনের পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে প্রশিক্ষণ দিয়ে লাইসেন্সের আওতায় আনা হবে।
এ ছাড়া নির্ধারণ করা হবে চলাচলের সড়ক। যানবাহনের সংখ্যা, রুট, চালক ও চলাচল ব্যবস্থাপনাও নিয়ন্ত্রণ করা হবে। একটি নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে যাতে একাধিক অটোরিকশা চালানো না যায়, সে ব্যবস্থাও করা হবে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে ব্যাটারি ও যানবাহন ট্র্যাক করার ব্যবস্থার কথাও জানান মন্ত্রী।
কর্মসংস্থান ব্যাহত না করে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য
রেহানা আক্তার রানু বলেন, তিনি অটোরিকশা নিষিদ্ধ করার কথা বলেননি; বরং এসব যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন। অটোরিকশার সঙ্গে বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত হওয়ায় বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া বাহন জব্দ, ডাম্পিং বা চালকদের হয়রানি না করার আহ্বান জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং নীতিমালা ও বিধি প্রণয়নের অগ্রগতি হয়েছে। কর্মসংস্থান যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, পরিবেশ রক্ষা হয় এবং যানবাহনের শৃঙ্খলা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হয়—সবদিক বিবেচনায় নিয়ে নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হবে।
সরকারের লক্ষ্য বেকারত্ব না বাড়িয়ে ও কর্মসংস্থান ব্যাহত না করে পরিবেশ রক্ষা এবং বৈদ্যুতিক তিন চাকার যানবাহনের সুশৃঙ্খল চলাচল নিশ্চিত করা।
প্রতিবেদকের নাম 




















