ব্যাংক খাতে সংস্কার ও ঋণ আদায়ে জোরদার উদ্যোগের ফলে গত নয় মাসে দেশে খেলাপি ঋণের অনুপাত প্রায় ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ থাকা খেলাপি ঋণের অনুপাত ২০২৬ সালের জুনে কমে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নয় মাসে খেলাপি ঋণের অনুপাত কমেছে ২ দশমিক ৯৫ শতাংশীয় পয়েন্ট। তবে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখনো উল্লেখযোগ্য। জুন শেষে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের অনিয়ম এবং আড়ালে থাকা খেলাপি ঋণ শনাক্ত করে ব্যাংকগুলোর হিসাব-নিকাশ পরিষ্কার করার প্রক্রিয়ার মধ্যেই খেলাপি ঋণের অনুপাতে এ পরিবর্তন এসেছে। এতে একদিকে অনুপাতে কিছুটা স্বস্তি এলেও ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্রও আগের তুলনায় স্পষ্ট হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আগে গোপন থাকা বা পুনঃতফসিলের মাধ্যমে আড়াল করা অনেক ঋণের প্রকৃত অবস্থা সামনে এসেছে।
তিনি জানান, খেলাপি ঋণ কমাতে এককালীন প্রস্থান নীতি এবং সর্বোচ্চ ১৫ বছর মেয়াদে ঋণ পুনঃতফসিলসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপের সুফল পুরোপুরি কার্যকর হলে খেলাপি ঋণের অনুপাত আরও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুনে তা সামান্য বেড়ে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা হলেও মোট ঋণের তুলনায় খেলাপি ঋণের অনুপাত কমেছে।
সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আগের সময়ে প্রকাশিত খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যান ব্যাংক খাতের প্রকৃত পরিস্থিতি পুরোপুরি তুলে ধরেনি। ব্যাংক খাতের সংকট কাটিয়ে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারে সংস্কারের পাশাপাশি ঋণ আদায় ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলাপি ঋণের অনুপাত কমার বর্তমান প্রবণতা ইতিবাচক হলেও এটিকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রকৃত খেলাপি ঋণ শনাক্ত করার প্রক্রিয়ায় স্বল্পমেয়াদে অনুপাত বাড়তেও পারে। তবে ব্যাংকের হিসাব-নিকাশে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করা টেকসই সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
তাদের মতে, শুধু প্রকাশিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানোর পরিবর্তে এর কাঠামোগত কারণ দূর করতে হবে। ঋণ আদায় জোরদার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই-বাছাই এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর সংস্কার কাঠামোও জোরদার করেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদনের মানদণ্ড আইএফআরএস-৯ অনুযায়ী প্রত্যাশিত ঋণক্ষতি হিসাব চালু হলে সম্ভাব্য ঋণঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করার সুযোগ বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, গত নয় মাসে খেলাপি ঋণের অনুপাত কমার প্রবণতা ব্যাংক খাতের সংস্কারে একটি প্রাথমিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এ অগ্রগতি কতটা টেকসই হয়েছে, তা বুঝতে পরবর্তী সময়ের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
প্রতিবেদকের নাম 



















