দাম বাড়েনি, অথচ বাজারে তেল মিলছে না—সয়াবিন তেল নিয়ে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে ভোক্তাদের মধ্যে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, মিলগেট থেকে সরবরাহ কমিয়ে বাজারে চাপ তৈরির চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে ভোক্তা অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, বাজারে সরবরাহ কমিয়ে সরকারকে মূল্যবৃদ্ধিতে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করছে বড় কোম্পানিগুলোর একটি অংশ। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে তেলের সংকট নেই এবং নতুন করে দাম বাড়ানোর কোনো প্রস্তাবও সরকারকে দেওয়া হয়নি।
বাজারে কোথায় কতটা ঘাটতি
শুক্রবার রাজধানীর নয়াবাজারে ছয়টি মুদি দোকান ঘুরে চারটিতে এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ পাওয়া যায়নি। একইভাবে জিনজিরা কাঁচাবাজারের আটটি দোকানের মধ্যে তিনটিতে এক লিটারের বোতল এবং দুটিতে দুই লিটারের তেল পাওয়া গেছে। তবে পাঁচ লিটারের বোতল তুলনামূলকভাবে পাওয়া যাচ্ছিল।
জিনজিরা কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী সাগরের দাবি, দৈনিক ২০ কার্টন এক ও দুই লিটারের সয়াবিন তেলের চাহিদা থাকলেও ডিলারদের কাছ থেকে তারা পাচ্ছেন মাত্র দুই থেকে চার কার্টন।
তার অভিযোগ, সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে আগের মতো বাজারে দাম বাড়ানোর পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে।
নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে খোলা তেল
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার নির্ধারিত দাম বহাল থাকলেও খোলা সয়াবিন তেল কোথাও কোথাও প্রতি লিটার ১৯৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। নির্ধারিত দামের তুলনায় এটি ১৫ টাকা বেশি।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, দেশের চার থেকে পাঁচটি বড় কোম্পানি সয়াবিন তেলের বাজারের প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। তার অভিযোগ, এসব কোম্পানি বিভিন্ন সময়ে ডিলারদের মাধ্যমে সরবরাহ কমিয়ে বাজারে চাপ তৈরি করে এবং পরে মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নেয়।
তার মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
এর আগে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব
বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধি ও আমদানি ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে গত ১১ জুলাই ভোজ্যতেলের দাম লিটারে ৮ থেকে ১০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন।
ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১০ টাকা বাড়িয়ে ২০৯ টাকা করার কথা বলা হয়েছিল। একইভাবে পাঁচ লিটারের বোতল ১ হাজার ১৫ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৮ টাকা বাড়িয়ে ১৮৮ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
পরে ২ সেপ্টেম্বর এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম ৪ টাকা বাড়িয়ে ১৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
কোম্পানিগুলোর বক্তব্য কী
বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানি ও পরিবহণ ব্যয়ও বেড়েছে। এসব কারণে বর্তমান বাজারদরের তুলনায় লিটারে ১৮ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে বলে তাদের দাবি।
অন্যদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কাওরান বাজারের এক ডিলার দাবি করেছেন, কোম্পানিগুলো আবারও দাম বাড়াতে চায় বলেই ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। কোম্পানি থেকে পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় খুচরা বাজারেও সরবরাহ কমে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
‘নতুন করে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব আসেনি’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্যসংক্রান্ত টাস্কফোর্সের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজার ও পরিবহণ ব্যয় বিবেচনায় ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তবে সরকার পরিস্থিতি বিবেচনায় লিটারে ৫ টাকা দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
তার ভাষ্য, বর্তমানে ভোজ্যতেলের কোনো সংকট নেই এবং নতুন করে দাম বাড়ানোর জন্য কোম্পানিগুলো সরকারের কাছে কোনো চিঠিও দেয়নি।
তবে সরবরাহ কমিয়ে মূল্যবৃদ্ধির পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করা হলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।
ফলে বাজারে সরবরাহের এই টান সাময়িক নাকি এর পেছনে সত্যিই মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরির কোনো কৌশল রয়েছে—সেটিই এখন নজরে রাখার বিষয়।
প্রতিবেদকের নাম 

























