মহেশখালীর দুটি এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। টার্মিনাল দুটির সম্মিলিত সক্ষমতার বিপরীতে বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৩৭ শতাংশ। ফলে প্রায় ৬৩ শতাংশ সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় নগরীর বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে। ব্যাহত হচ্ছে শিল্পকারখানার উৎপাদন। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় আবাসিক গ্রাহকরাও রান্নাবান্নাসহ দৈনন্দিন কাজে ভোগান্তিতে পড়েছেন।
পেট্রোবাংলার উৎপাদন ও বিপণন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ১০টা পর্যন্ত মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জি ও সামিট এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৪১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে।
টার্মিনাল দুটির সম্মিলিত রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির সক্ষমতা ৬০০ এবং সামিটের ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সেই হিসাবে বর্তমানে পূর্ণ সক্ষমতার মাত্র ৩৭ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
এক্সিলারেটের বয়লার বন্ধ, সামিটে বৈরী আবহাওয়া
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এক্সিলারেট এনার্জির দুটি বয়লারের মধ্যে একটি বর্তমানে চালু রয়েছে। অপরটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। মেরামত শেষে সেটি চালু করা গেলে সরবরাহ বাড়তে পারে।
অন্যদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সামিটের টার্মিনালেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। একটি এলএনজি জাহাজ সেখানে অবস্থান করলেও বাতাসের গতি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সেটি নিরাপদে বার্থিং করতে পারছে না। ফলে জাহাজ থেকে এলএনজি আনলোডিং শুরু করা সম্ভব হয়নি।
আবহাওয়া পরিস্থিতি অনুকূলে এলে কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করছে।
চট্টগ্রামে ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ঘাটতি
মহেশখালীর সরবরাহ সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে বুধবার সকালে সরবরাহ পাওয়া গেছে মাত্র ২১০ মিলিয়ন ঘনফুট।
অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ঘাটতি প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট বা ৪০ শতাংশ।
সরবরাহ কমে যাওয়ায় আবাসিক গ্রাহক ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ অপেক্ষা
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের। মুরাদপুরের একটি সিএনজি স্টেশনে বুধবার সকাল থেকেই দীর্ঘ লাইন দেখা যায়।
স্টেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্বাভাবিকের তুলনায় গ্যাসের চাপ অনেক কম থাকায় একটি গাড়িতে গ্যাস দিতে বেশি সময় লাগছে। ফলে একদিকে দীর্ঘ হচ্ছে গাড়ির সারি, অন্যদিকে কমে যাচ্ছে চালকদের দৈনিক আয়।
নগরীর ওয়াসার মোড় ও টাইগারপাস এলাকার কয়েকটি স্টেশনেও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ বা সীমিত থাকতে দেখা গেছে।
আবাসিক গ্রাহকরাও ভোগান্তিতে
গ্যাস সংকটের কারণে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়িতেও রান্নাবান্নায় সমস্যা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় দৈনন্দিন জীবন আরও দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে।
সংকটের তথ্য নিয়মিত প্রকাশের দাবি
গ্যাস পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত ও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক খন্দকার বেলায়েত হোসেন।
তিনি কোভিড-১৯ সময়ের দৈনিক বুলেটিনের মতো গ্যাস পরিস্থিতি নিয়েও নিয়মিত ‘দৈনিক গ্যাস পরিস্থিতি বুলেটিন’ প্রকাশের প্রস্তাব দিয়েছেন। এতে গ্যাসের চাহিদা, উৎপাদন ও সরবরাহ, ঘাটতি, এলএনজির অবদান এবং বিদ্যুৎ, শিল্প, সার ও আবাসিক খাতে সরবরাহের তথ্য রাখার কথা বলেছেন তিনি।
তার মতে, কোন এলাকায় কত ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে, গ্যাসের চাপ কত এবং সংকটের কারণে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনে কী প্রভাব পড়ছে—এসব তথ্যও নিয়মিত জানানো প্রয়োজন।
কবে স্বাভাবিক হবে গ্যাস সরবরাহ?
গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর সেখানে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়। পরে ৬ আগস্ট একটি বয়লার চালু করে আংশিকভাবে সরবরাহ শুরু করা হলেও দ্বিতীয় বয়লারটি এখনো মেরামতের আওতায় রয়েছে।
এর সঙ্গে সামিটের টার্মিনালে বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজি জাহাজ থেকে গ্যাস খালাস বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
দুটি টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে না পারলে চট্টগ্রামের শিল্প, পরিবহন ও আবাসিক খাতে গ্যাসের সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদকের নাম 



















