রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে সহস্রাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষানিরীক্ষার যন্ত্র নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে গিয়ে রোগীদের অনেক ক্ষেত্রেই বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়, ভোগান্তি এবং রোগীদের আর্থিক চাপ।
সরকারের ‘ন্যাশনাল ইলেক্ট্রো-মেডিক্যাল ইক্যুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার’ (নিমিউ অ্যান্ড টিসি) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
নিমিউ অ্যান্ড টিসির এক কর্মকর্তা জানান, সরকারি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি বিকল থাকায় অনেক রোগীকে বাইরে গিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করাতে হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কিছু ক্ষেত্রে দালালচক্র রোগীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যায়। পাশাপাশি নষ্ট যন্ত্রপাতি মেরামতের নামে অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের অভিযোগও রয়েছে।
মেরামতে মাসের পর মাস, বাড়ছে রোগীর দুর্ভোগ
রাজধানীর একাধিক সরকারি হাসপাতালে সরেজমিনে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক্স-রে, এমআরআই, আলট্রাসনোগ্রামসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ে।
রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তির মেয়াদ থাকলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে যন্ত্র মেরামতের জন্য জানানো হয়। তবে চিঠি চালাচালি ও যোগাযোগের পর প্রকৌশলী বা টেকনিশিয়ান পাঠাতেও অনেক সময় লেগে যায়।
আর রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। তখন নষ্ট যন্ত্র মহাখালীতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি মেরামত কারখানা নিমিউ অ্যান্ড টিসিতে পাঠানো হয়।
সেখানে মেরামত সম্ভব হলে তা করা হয়। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ না থাকলে সেগুলো সরবরাহের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় মাসের পর মাস সময় লেগে যায়। ফলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে না পেরে রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়ে।
এ ছাড়া ঠিকাদার নিয়োগ ও যন্ত্রাংশ কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। অনেক সময় মেরামতের পর অল্প দিনের মধ্যেই যন্ত্র আবার বিকল হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
বিভাগীয় পর্যায়ে কার্যালয়ের পরামর্শ
মহাখালীর নিমিউ অ্যান্ড টিসিতে সরেজমিনে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জনবল সংকটের বিষয়টি জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি এর কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিষ্ঠানটির এক শীর্ষ কর্মকর্তা ঢাকা, রাজশাহী, রংপুর, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে এবং পুরোনো ১৬টি জেলায় কার্যালয় স্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের আঞ্চলিক কার্যালয় থাকলে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর বিকল যন্ত্র দ্রুত মেরামত করা সম্ভব হবে।
সরকারি হাসপাতালে বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ চালুর তাগিদ
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামান বলেন, পরিস্থিতি নিরসনে প্রতিটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল ও জেলা সদর হাসপাতালে বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ চালু করা জরুরি।
দেশে এ বিষয়ে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি হচ্ছে বলেও জানান তিনি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ (বুয়েট) কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ চালু রয়েছে।
বুয়েটের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের বেশি সময় আগে সেখানে বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ চালু হয়েছে। প্রতি বছর এ বিষয়ে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও এ বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় জনবল তৈরির সুযোগ থাকলেও সরকারি হাসপাতালগুলোতে তা কাজে লাগানোর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অধিকাংশ হাসপাতালে নেই বিশেষায়িত বিভাগ
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ নেই। তবে নিউরোসায়েন্সেস ইনস্টিটিউট ও বার্ন ইনস্টিটিউটে এ ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত কুমার বিশ্বাস বলেন, প্রতিটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং বিভাগীয় ও জেলা হাসপাতালে বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে ডিপ্লোমাধারী বা প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান রাখাও প্রয়োজন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে এ উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি উল্লেখ করে তিনি জানান, এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে কার্যক্রম শুরু করা হবে।
প্রতিবেদকের নাম 




















