একসময় ‘রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র’ হিসেবে পরিচিত ছিল চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ, অপরাধচক্রের দাপট এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হওয়া সেই এলাকাতেই এবার নির্মাণ করা হচ্ছে দেশের অন্যতম আধুনিক কারাগার। দীর্ঘদিনের আতঙ্কের জনপদকে সংশোধন ও পুনর্বাসনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার এই উদ্যোগকে নতুন সম্ভাবনার সূচনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী এবং নগরের বায়েজিদ, পাহাড়তলী ও খুলশী সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি অঞ্চল জঙ্গল সলিমপুর বহু বছর ধরে অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্ছেদ অভিযানেও বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। এমনকি কয়েক মাস আগেও সেখানে র্যাব সদস্য হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। তবে বর্তমানে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর এলাকাটিকে উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রায় ৭০ একর জমির ওপর আধুনিক এই কারাগার নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমি বরাদ্দের জন্য ইতোমধ্যে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন কারাগারে প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রাম মহানগর আদালতের বিচারাধীন প্রায় দুই হাজার বন্দিকে স্থানান্তর করা হবে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া জানিয়েছেন, বর্তমান কেন্দ্রীয় কারাগার দীর্ঘদিন ধরেই অতিরিক্ত বন্দির চাপে কার্যত অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। প্রায় ১৪০ বছর পুরোনো কারাগারটির ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৪৯ জন হলেও বর্তমানে সেখানে ৬ হাজারের বেশি বন্দি অবস্থান করছেন। ফলে বন্দি ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কারা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, নতুন কারাগার চালু হলে মহানগর এলাকার হাজতি ও কয়েদিদের আলাদা রাখা সম্ভব হবে। এতে বন্দি ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর ও সুশৃঙ্খল হবে। একই সঙ্গে কারাগারটিকে শুধু বন্দিশালা হিসেবে নয়, বরং সংশোধন ও পুনর্বাসনের আধুনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন এই কারাগারে বন্দিদের জন্য শিক্ষা, খেলাধুলা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ রাখা হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্দিরা যেন সাজা শেষে সমাজে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেন, সেই লক্ষ্য নিয়েই পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। আধুনিক বিশ্বে কারাগার ব্যবস্থার যে পরিবর্তিত ধারণা—‘শাস্তির পাশাপাশি সংশোধন’—তা বাস্তবায়নের চেষ্টা থাকবে এখানে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা পাহাড়ি এলাকায় কারাগার নির্মাণ নিয়ে পরিবেশগত বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে পরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। মানবাধিকারকর্মীরাও বলছেন, প্রকৃতি সংরক্ষণ নিশ্চিত রেখে বন্দিদের মানবিক পরিবেশে রাখার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এটি ইতিবাচক উদাহরণ হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, জঙ্গল সলিমপুরে আধুনিক কারাগার নির্মাণ কেবল একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়; এটি অপরাধপ্রবণ একটি অঞ্চলকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নের আওতায় আনার প্রতীকী পদক্ষেপও। আতঙ্কের জনপদ থেকে পুনর্বাসনের কেন্দ্র—এই পরিবর্তন চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়ন ব্যবস্থায় নতুন বার্তা দিচ্ছে।
প্রতিবেদকের নাম 





















