
মোবাইল ফোন এখন আধুনিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যাংকিং, ব্যবসা ও বিনোদন—প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার রয়েছে। তবে অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানুষের ঘুম, চোখ, শারীরিক সুস্থতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মত দিয়েছেন ড. আব্দুল ওয়াদুদ।
প্রযুক্তিকে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমস্যা প্রযুক্তির মধ্যে নয়; বরং প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরনে। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সময় মোবাইল ফোনে কাটানো এবং এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়াই বড় সমস্যা।
মোবাইল ব্যবহারের অন্যতম প্রভাব পড়তে পারে ঘুমের ওপর। বিশেষ করে রাতে বিছানায় শুয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, ভিডিও দেখা, গেম খেলা কিংবা বারবার মেসেজ চেক করার কারণে অনেকের ঘুমাতে দেরি হয় এবং ঘুমের মানও কমে যেতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় কিশোরদের ক্ষেত্রে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের সঙ্গে কম ঘুম ও ঘুমের সমস্যার সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে।
দীর্ঘ সময় মোবাইল, কম্পিউটার বা ট্যাবের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখে শুষ্কতা, জ্বালা, অস্বস্তি, ঝাপসা দেখা ও চোখের ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। তবে স্ক্রিন ব্যবহার করলেই চোখ নষ্ট হয়ে যাবে—এমন সরল সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। দীর্ঘ সময় একটানা স্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাস কমানোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মোবাইল ব্যবহারের আরেকটি সমস্যা হলো ঘাড়, কাঁধ ও পিঠে ব্যথা। দীর্ঘ সময় মাথা নিচু করে ফোন দেখলে পেশিতে অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। একই ধরনের সমস্যা ল্যাপটপ ও ট্যাব ব্যবহারের ক্ষেত্রেও দেখা দিতে পারে।
অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের কারণে শারীরিক কর্মকাণ্ডের সময়ও কমে যেতে পারে। হাঁটা, খেলাধুলা বা ব্যায়ামের পরিবর্তে দীর্ঘ সময় ভিডিও দেখা, গেম খেলা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের অভ্যাস তৈরি হলে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বাড়তে পারে। এর সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত খাবারের অভ্যাস যুক্ত হলে ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
শুধু শারীরিক নয়, অতিরিক্ত ও সমস্যাজনক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে উদ্বেগ, বিষণ্ণতার উপসর্গ, আত্মসম্মানবোধের সমস্যা এবং সামাজিক চাপের মতো মানসিক সমস্যার সম্পর্কও পাওয়া গেছে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহার ও মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক একমুখী নয়। মানসিক সমস্যায় থাকা ব্যক্তিরাও অনেক সময় ডিজিটাল জগতে বেশি সময় কাটাতে পারেন।
বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক পরিবারে শিশুকে শান্ত রাখা, খাবার খাওয়ানো কিংবা পড়তে বসানোর জন্য মোবাইল হাতে তুলে দেওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছে। এর ফলে শিশুর বিনোদন, খাবার, পড়াশোনা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে মোবাইলের নির্ভরতা তৈরি হতে পারে।
তবে মোবাইল ফোনের বিকিরণ নিয়ে প্রচলিত কিছু ধারণারও ব্যাখ্যা প্রয়োজন। মোবাইল ফোন থেকে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি বা RF তরঙ্গ নির্গত হয়। এগুলো এক্সরে বা গামা রশ্মির মতো ionizing radiation নয়। তাই মোবাইল ফোনের সব ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিকে শুধু বিকিরণের সঙ্গে যুক্ত করা ঠিক নয়।
বরং মোবাইল ফোনের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও স্পষ্ট ঝুঁকিগুলোর একটি হলো মনোযোগের বিচ্যুতি। বিশেষ করে গাড়ি চালানোর সময় ফোনে কথা বলা, মেসেজ লেখা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করলে চালকের মনোযোগ রাস্তা থেকে সরে যেতে পারে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তাই মোবাইল ফোন পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন হলো এর সঠিক ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। রাতে ঘুমানোর আগে কিছু সময় ফোন থেকে দূরে থাকা, বিছানায় ফোন না নেওয়া, একটানা দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহার না করা, নিয়মিত হাঁটা ও ব্যায়াম করা এবং শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহারে অভিভাবকের নজর রাখা—এসব অভ্যাস উপকারী হতে পারে।
এ ছাড়া খাবারের টেবিল ও পারিবারিক সময়কে মোবাইলমুক্ত রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করার জন্য তৈরি হয়েছে। তাই প্রযুক্তির ব্যবহার বন্ধ নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত ও সচেতন ব্যবহারই হতে পারে সুস্থ জীবনযাপনের অন্যতম উপায়।
লেখক: ড. আব্দুল ওয়াদুদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
প্রতিবেদকের নাম 




















